সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও নিরাপওা নিশ্চিত হোক
আজ ৩ মে ২০২৬ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ইউনেস্কো কর্তৃক দিবসটির এবারকার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে— ‘শান্তিপূর্ণ ভবিষৎ গঠন: মানবাধিকার, উন্নয়ন এবং নিরাপওার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসার।’ ইউনেস্কো’র ২৬তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশক্রমে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ৩ মে তারিখটিকে প্রতি বছর বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস (World Press Freedom Day) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
দিবসটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অধিকারকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়াই হচ্ছে বিশ্ব গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এক ধরণের বার্তা। জাতিসংঘ বলছে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, কারণ তথ্য হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণসম্পদ। তাই সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্ব স্ব দেশের সরকারের এ ব্যাপারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বলে রাখা ভাল, ভূল তথ্য এবং অপপ্রচার রোধে মুক্ত এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তি।
দিবসটি মূলতঃ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, মুক্ত চিন্তা ও পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সার্বজনীন তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা ও নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা আর তা সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অত্যাবশ্যকীয় ভূমিকায় প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্ব অপরিসীম।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা-বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু নানামুখী চাপে এটি আজ নোংরা রাজনীতি ও পেশী শক্তির নিকট জিম্মি। তবে সকল নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অপরিহার্য নিয়ামক গণমাধ্যমের অবাধ ও মুক্ত চিন্তা ভূমিকা পালনে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়।
নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া সমাজে ভালো কিছু আশা করা যায় না। সমাজের সব ক্ষেত্রে অর্থবহ পরিবর্তনের জন্য গণমাধ্যমের ভূমিকা এখন অনিবার্য। আজকাল সমাজে সোশ্যাল মিডিয়া অত্যান্ত গুরুত্ব বহন করছে। এ মিডিয়া এখন সকলের হাতে হাতে। একজন অতি সাধারণ ব্যক্তি মানুষও ফেসবুক, মোবাইল, ইন্টারনেট ইত্যাদির মাধ্যমে এই প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে মিডিয়া হিসাবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ গ্রহন করছে। সোশ্যাল মিডিয়া বর্তমান যুগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ মিডিয়াতে যে কেউ চাইলেই অতি সহজে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য যাচাই করে নিজের মতামত গড়ে তুলতে পারে। এখন অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ন্যায় বিচার পেয়ে আসছে, যা কম কথা নয়। তাই ইচ্ছে করলেই এ মাধ্যমকে আটকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
বিগত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নিরাপওা বলতে কিছুই ছিল না। সংবাদ সংগ্রহ বা গণমাধ্যমকর্মীর উপর আক্রমন ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের জন্য হুমকিস্বরূপ। সংবাদপত্র অফিসসমূহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া এবং সাংবাদিকদের মেরে ফেলার হুমকি এক ধরনের মব ভায়োলেন্স কত যে অমানবিক ছিল যা ভাষায় প্রকাশ করা বেদনাদায়ক।
তবে কেউ কেউ যদি মুক্ত গণমাধ্যমকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বা পুড়িয়ে দেয় তখন তার সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্থ হতে বাধ্য। এধরনের আক্রোশ, হামলা, আক্রমন ও নিপীড়ন রোধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা এখন খুবই জরুরি। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনও পুলিশ, ছাত্র, ব্যবসায়ী ও পেশী শক্তি ও দুর্বৃত্তদের অহরহ হামলার শিকার হচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। বিচারহীনতা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনাগুলো বাংলাদেশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের মাঝে আতংক বা উদ্বিগ্ন হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করছে। রাষ্ট্রকে অনুধাবন করতে হবে যে, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম কখনই সরকারের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক এবং সহায়ক।
প্রতি বছর বাংলাদেশে সাংবাদিক নিপীড়নের শিকার বাড়ছে। ফ্যাসিষ্ট সরকারের সময় সংবাদপত্র, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা সব সময় ডিজিটাল বা সাইবার সিকিউরিটি আইনের ভয়ে তটস্থ বা আতংকের মধ্যে ছিল ঠিকই কিন্তু দেশে যে ধরনের মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে তা নিয়ে দেশের মানুষ উদ্ধিগ্ন ও আতঙ্কিত। জুলাই গণ অভ্যুথানের মাধ্যমে একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, যেখানে থাকবে তথ্য ও মত প্রকাশ মুক্ত স্বাধীন চেতনার নূতন বাংলাদেশের স্বপ্ন, কিন্তু তা আজ উপেক্ষিত।
৫ আগষ্টের পর তৎকালীন সরকারের চাপের মুখে অনেক প্রেস ও ইলেক্ট্রনিক মিড়িয়ার বহু গণমাধ্যমকর্মী এক ধরনের মবের শিকার হয়ে হেনেস্তা ও নির্যাতিত হয়েছেন। দেশে সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীদের উপর হয়রানি-নিপীড়ন আগের থেকে বেড়েছে না কমেছে তা বলার অবকাশ রাখে না । সাংবাদিক হয়রারি এখনও চলমান যা দেখার কেউ নেই। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিপীড়িত হওয়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেশের গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে, পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোন সাংবাদিক যেন কোন ধরনের হয়রানি বা ঝুঁকির মুখে না পরে। তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। তবে সাংবাদিক ও গণমাধম্যের স্বাধীনতা না থাকলে দেশটি জনগণের রাজত্বের পরিবর্তে দুর্বৃত্তদের রাজত্ব চলে আসবে। এ অবস্থায় সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরাও যদি সঠিক দায়িত্ব পালন না করতে পারে তাহলে দেশটির অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পরবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য তিন ধরনের নিরাপত্তা খুবই দরকার—আইনি, অর্থনৈতিক ও দৈহিক। বিগত কোন সরকারই সাংবাদিক দম্পওি সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। দেশে অন্য বহু সাংবাদিক হত্যার বিচার তাদের পরিবার আজও পায়নি, যা অমানবিক ও দুঃখজনক।
দেশে অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগ থাকলেও কিছু কিছু নিত্য নুতন আইন স্বাধীন সাংবাদিকতায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা আইনের কিছু কিছু ধারার অপব্যবহারের কারণে আওয়ামী লীগ ও অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে অনেক লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবি ও গণমাধ্যমকর্মীরা অযথা হেনেস্তার শিকার হয়েছিল এমনকি জেল জুলুম খেটেছেন। মনে রাখতে হবে সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে জাতির কাছে ভুল-ত্রুটি ও অভাব-অভিযোগ তুলে ধরেন। যেখানে প্রেস কাউন্সিল আছে সেখানে কোন প্রকার নিরাপত্তা আইনটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত তার সত্যতা খুজে পাওয়া দুস্কর । গণতন্ত্র যেখানে দূর্বল, সেখানে স্বাধীন গণমাধ্যম টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশে সর্বত্র সংবাদপত্র, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমসমূহকে বিভিন্ন চাপের মধ্যে থাকতে হয় যা কখনই মুক্ত সাংবাদিকতা নয়।
জাতিসংঘ বলছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিপন্ন হতে চলছে । দিন দিন জাতিসংঘের সূচকে বাংলাদেশ এখনও অনেক নিচে। বলে রাখা ভাল, বিশ্বের বৃহওম গণতন্ত্রে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখন ঝুকির মুখে। জাতিসংঘ আরও বলছে, তথ্য হচ্ছে একটি গণসম্পদ, ভুল তথ্য এবং অপপ্রচার রোধে মুক্ত এবং স্বাধীন গণমাধ্যম সবচেয়ে বড় শক্তি। বিশ্বের অনেক দেশই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা নতুন নতুন আইন, বিধিনিষেধ, সেন্সরশিপ, অপব্যবহার, হয়রানি, আটকসহ অনেক অবৈধ আইন তৈরি করে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সত্য কথা লেখার পরিবেশকে বাধাগ্রস্থ করার চেষ্টা করে।
আফগানিস্তানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর ক্রমশ একধরনের চাপ প্রয়োগ বাড়ছে। যা কখনই গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়। তবে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবাদিক সমাজকে সাহসী ভূমিকা পালন করে যেতে হবে। গণমাধ্যমের ঝুঁকি বিশ্ব জুড়েই বেড়ে চলছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তেমন ভালো নয়। মুক্ত সাংবাদিকতা ও টেকসই উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের যেকোনো অনিয়ম-দূর্নীতি হলে তা সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীরা দেশের স্বার্থে গণমাধ্যমে তুলে ধরা মানে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা নয় বরং সরকারকে সহায়তা করা। গুজব, মিথ্যা, অসত্য ও অপপ্রচার ইত্যাদির বিরুদ্ধে কার্যকর বস্তুই হচ্ছে মুক্ত গণমাধ্যম। কোন নিয়ন্ত্রিত নয়, মুক্ত গণমাধ্যমই হোক দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর। এতে পেশার স্বাধীনতা ও নিরাপওা নিশ্চিত হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
লেখক: মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী। গণমাধ্যমকর্মী ও কলাম লেখক।
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব।
