ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে, শৃঙ্খলা না মানলে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা

পুলিশের কেউ কেউ এখনও ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য শৃঙ্খলা না মানলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সরকার পিছপা হবে না।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজারবাগ পুলিশ অডিটোরিয়ামে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রের দৃশ্যমান অবয়ব হিসেবে জনগণের সঙ্গে পুলিশের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। একজন নাগরিক অপরাধের শিকার হলে কিংবা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করলে প্রথমেই যান পুলিশের কাছে। তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করা কিংবা আইনের প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার বিষয়টিও পুলিশের দায়িত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে চাই, যে বাহিনী দক্ষতা ও পেশাদারিত্বে আধুনিক, প্রযুক্তিতে সক্ষম, আচরণে মানবিক, আইন প্রয়োগে দৃঢ়, দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষ এবং জনগণের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক হবে। বর্তমান বিশ্বে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল জালিয়াতি, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি প্রযুক্তি, তথ্য ও আধুনিক তদন্ত কৌশলের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় স্বতন্ত্র সাইবার ইউনিট চালু করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আস্থা অর্জন। জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত কয়েক মাসে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক, লেজিসলেটিভ এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এই তিন ধরনের সহায়তার মাধ্যমে পুলিশের ইমেজ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনআস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশ সদস্যদের নিজেদের মনোবল ও জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে জনগণের সঙ্গে সম্মানজনক ও মানবিক আচরণ করতে হবে। মানুষের কথা শুনতে হবে এবং তাদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আইনের মধ্যে থেকে দ্রুততম সময়ে প্রত্যাশিত সেবা দেয়ার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বাহিনীর দক্ষ ও নিষ্ঠাবান সদস্যরা পুলিশকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং কল্যাণের বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। পুলিশের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
পদকপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পদক তাদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি হলেও একই সঙ্গে এটি আরও বড় দায়িত্বের অঙ্গীকার। দায়িত্ব পালনে তাদের আরও বেশি সততা, সাহস, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিপ্লব সংঘটিত হয় সমাজ পরিবর্তন, অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য। দেশে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে এবং হারিয়ে যাওয়া নাগরিক, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবিতে।
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ভিত্তি, জনআকাঙ্ক্ষা ও ব্যাপক জনপ্রত্যাশার ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত সরকারের ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। সরকার শাস্তি ও পুরস্কারে বিশ্বাস করে এবং শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমন করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, হয়তো শতভাগ ন্যায়বিচার প্রত্যেকের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে শৃঙ্খলাভঙ্গের ক্ষেত্রে সরকার কঠোর হবে। কেউ ইনডিসিপ্লিন করলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযুক্ত করতেও সরকার পিছপা হবে না। পুলিশের তৃণমূল পর্যায় থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবাইকে উদ্দেশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এবং জনপ্রত্যাশা পূরণের জন্য সরকার কঠোর হতে বাধ্য হবে। তিনি বলেন, পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি অন্যান্য বাহিনীর মতো পুলিশ বাহিনীকেও অপব্যবহার ও রাজনৈতিকভাবে মিসইউজ করেছে এবং জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। অনেকেই অবৈধ ও বেআইনি নির্দেশ পালন করতে বাধ্য হয়েছেন। এমন বাস্তবতায় পুলিশ সদস্যদের সংশোধনের এবং জনআস্থা অর্জনের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
এনএনবাংলা/এনজেড
