ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে।অতীতে যেখানে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল নির্বাচনের সময় নানা কারণে কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকত—নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার বা আন্দোলনের কারণে মাঠে নামতে পারত না—এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে দীর্ঘদিন পর দেশ একটি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণ ভোটাররা এটিকে ২০০৯ সালের পর সবচেয়ে অংশগ্রহণমূলক ভোট হিসেবে দেখছেন। খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রার্থী দিয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের বিষয়ে তারা যথেষ্ট আশাবাদী। অন্যদিকে ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীও শক্ত অবস্থান নিয়ে নির্বাচনে লড়ছে। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর দেশজুড়ে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতে—বিশেষ করে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাতে। ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের বিশ্লেষক পারভেজ করিম আব্বাসি জানান, বিভিন্ন মতামত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও অনেক ভোটার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। বিশেষ করে জেনারেশন জেডের ভোট এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখবে।
এবারের নির্বাচনী পরিবেশ আগের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পোস্টার চোখে পড়ছে। দলীয় কার্যালয়গুলোতে নির্বাচনী গান ও প্রচারণার আমেজ বিরাজ করছে—যা বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একতরফা প্রচারণার চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি বিপরীত।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ভোটারদের সমর্থন ধর্মীয় কারণে নয়; বরং দলটির তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এবারের ভোটাররা দুর্নীতি দমন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ধর্মীয় ইস্যু বা প্রতীকী রাজনীতি তুলনামূলকভাবে কম প্রভাব ফেলছে।
তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করবে। প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব বলেন, “আগে ভোট দেওয়া বা মত প্রকাশ করা কঠিন ছিল। আশা করি নতুন সরকার এই স্বাধীনতা বজায় রাখবে।”
আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিক থেকেও এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতীয় প্রভাব কিছুটা কমেছে এবং চীনের উপস্থিতি বেড়েছে। বিএনপি ভারতের সঙ্গে তুলনামূলক নমনীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে পাকিস্তানের দিকে ঝোঁক বাড়তে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও দলটি জানিয়েছে, তারা কোনো দেশের প্রতি পক্ষপাতমূলক অবস্থান নেবে না।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দেশ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং বিনিয়োগ হ্রাসের কারণে ২০২২ সালের পর থেকে বাংলাদেশ বড় ধরনের বিদেশি অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে পড়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নয়—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনই হবে দেশের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
২০০৯ সালের পর জন্মগ্রহণকারীদের ধূমপান নিষিদ্ধ, আইন করছে যুক্তরাজ্য
তিন বছরে ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ, আরও বহু ঝুঁকিতে: বিজিএমইএ
মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ: আইএমএফ