শেখ হাসিনার আমলে দুই বিচার নিয়ে কী বলেছিলেন নাভি পিল্লাই?

এ বছর শান্তিতে নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাই ২০১৩ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশের দুটি বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিডিআর সদস্যদের বিচার। তিনি বলেছিলেন, গুরুতর অপরাধের বিচার জরুরি হলেও তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করেই করতে হবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভি পিল্লাই ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
একাত্তরের বিচার নিয়ে উদ্বেগ
২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে পিল্লাই বলেন, ১৯৭১ সালে সংঘটিত নৃশংসতার বিচার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি। এ সময় ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে ওঠা প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান জানান।
পিলখানা মামলার গণবিচার নিয়ে সমালোচনা
একই বিবৃতিতে ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক বিডিআর সদস্যের বিচার নিয়েও কঠোর উদ্বেগ প্রকাশ করেন পিল্লাই। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর এ মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। খালাস পান ২৭৭ জন।
পিল্লাইয়ের মতে, শত শত আসামিকে একসঙ্গে বিচার, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার ঘাটতি এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি বলেন, এসব বিষয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান
বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগেরও স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেন পিল্লাই। নির্যাতনের অভিযোগে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে সংগৃহীত প্রমাণ আদালতে ব্যবহার না করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ ছাড়া প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ ও প্রমাণ পৃথকভাবে মূল্যায়ন, কার্যকর আইনি সহায়তা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার।
ন্যায্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
পিল্লাইয়ের বক্তব্যে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) এবং নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। আইসিসিপিআরের ১৪ অনুচ্ছেদে ন্যায্য বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং ৭ অনুচ্ছেদে নির্যাতন নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
তার বক্তব্যের মূল কথা ছিল, অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; তবে সেই প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির মৌলিক অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে। একাত্তরের অপরাধের বিচার কিংবা পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার—কোনোটিতেই ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড উপেক্ষা করা যায় না।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নে পিল্লাইয়ের ২০১৩ সালের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, মৃত্যুদণ্ড, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং অভিযুক্তদের ন্যায্য বিচারের অধিকার নিয়ে তার উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এনএনবাংলা/
