সিকদার পরিবারের বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ নিয়ে চিন্তিত ব্যাংক
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার সুবাদে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সিকদার পরিবার ব্যাংকিংসহ নানা খাতে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে।
২০০৯ সালে জয়নুল হক সিকদারের নেতৃত্বে ন্যাশনাল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ধীরে ধীরে ব্যাংকটির ওপর পুরো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে পরিবারটি। নিয়ম ভেঙে পরিবারের পাঁচ সদস্য পরিচালক হন এবং একের পর এক এমডিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া ঋণ, বেনামি ঋণ, কমিশন বাণিজ্য ও অতিমূল্যে ভবন ভাড়া দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় তারা।
বর্তমানে সিকদার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মৃত্যু ও অসুস্থতার পর বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ আদায় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১১টি ব্যাংকে গ্রুপটির ঋণ ছিল ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা, যা এখন প্রায় ১২ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঋণের বড় অংশ বিদেশে পাচার করে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও দুবাইয়ে ব্যবসা ও সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
জয়নুল হক সিকদার ২০২১ সালে দুবাইয়ে মারা যাওয়ার পর চেয়ারম্যান হন তাঁর স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মারা যান। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার মূলত ব্যবসা পরিচালনা করতেন। সম্প্রতি রন হক সিকদারও দুবাইয়ে মারা গেছেন এবং রিক হক সিকদার অসুস্থ বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর পরিবারের কাউকে দেশে দেখা যায়নি।
সরকার শেখ হাসিনা পরিবার ও সিকদার গ্রুপসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচার তদন্তে যৌথ তদন্ত দল গঠন করেছে। ইতোমধ্যে বিদেশে সিকদার পরিবারের বিভিন্ন সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। অগ্রণী, আইএফআইসি ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে বিদেশি আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিকদার পরিবারের ১৪ সদস্যের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। তালিকায় ছিলেন মনোয়ারা সিকদার, রিক হক সিকদার, রন হক সিকদার, পারভীন হক সিকদারসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য।
এদিকে ন্যাশনাল ব্যাংক অতীতে এস আলম গ্রুপের ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এছাড়া ২০২০ সালে এক্সিম ব্যাংক থেকে জামানত ছাড়া ৫০০ কোটি টাকার ঋণ না পেয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে রন হক সিকদার ও দীপু হক সিকদারের বিরুদ্ধে।
সিকদার পরিবারের আচরণ ও প্রভাবের কারণে ন্যাশনাল ব্যাংকে একের পর এক এমডি পদত্যাগ করেন। এমনকি ২০২১ সালে দায়িত্ব নেওয়া ব্যাংকার মেহমুদ হোসেনও এক বছরের মাথায় পদত্যাগে বাধ্য হন বলে জানা যায়। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে উঠে আসে, ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে পরিবারটি প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ ডলার বিদেশে পাচার করেছে।
গত মাসে জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই তালিকায় থাকা সিকদার গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠান হলো পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেড ও সিএলসি পাওয়ার।
এনএনবাংলা/
