ভারত থেকে কথিত বাংলাদেশিদের ফেরা নিয়ে কী ঘটছে সীমান্তে?

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা সংলগ্ন ভারতের হাকিমপুর সীমান্তে অবৈধভাবে দেশটিতে যাওয়া কয়েকশ কথিত বাংলাদেশি ফেরার জন্য জড়ো হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তে সপ্তাহ খানেক ধরে প্রতিদিনই ‘বাংলাদেশি’ নাগরিক পরিচয়ে অনেকে যে জড়ো হচ্ছেন, এই বিষয়টি সরেজমিন দেখেছেন বিবিসির প্রতিবেদকও।
দাবি করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময় যারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন মূলত তারাই নিজ দেশে ফেরার জন্য এখন ওই সীমান্তে ভিড় করছেন।
তাদের নথিপত্র যাচাই করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য স্থানীয় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক শিবিরগুলোয় রাখা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
এমনকি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী শতাধিক কথিত বাংলাদেশিকে ইতোমধ্যে হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি-এর হাতে তুলে দিয়েছে বলেও দুই দেশের একাধিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
যদিও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বিজিবি কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের কেউই এই দাবির সত্যতা স্বীকার করেননি।
বিবিসি বাংলাকে তারা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর কিংবা জোর করে ঠেলে দেওয়া, কোনো প্রক্রিয়ায়ই কাউকে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর তথ্য সঠিক নয়।
তবে, সীমান্তের ওপারে অবৈধ বাংলাদেশি পরিচয়ে অনেক মানুষকে যে জড়ো করা হচ্ছে এই তথ্য তারাও শুনেছেন।
এ মাসের শুরুর দিকে আগে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন যে, বাংলাদেশ থেকে এসে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছেন পশ্চিমবঙ্গে, তাদের আর থাকতে দেওয়া হবে না। সেই সাথে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা ‘আটক কেন্দ্র’ তৈরিরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কী ঘটছে সীমান্তে?
অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্ত হত্যাসহ নানা ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা অনেকটা ধারাবাহিক রূপ নিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। পুশ ইন এর অভিযোগ কিংবা সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশে ভারত দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই অস্বস্তি রয়েছে।
কয়েকদিন আগেই সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্ত এলাকার দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে পালটাপালটি গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।
সম্প্রতি, বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা সংলগ্ন ভারতের হাকিমপুর সীমান্তে, অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা কথিত ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে কয়েকশ মানুষকে জড়ো করা হয়েছে।
যাদের কেউ কেউ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, ‘চোরাই পথে’ গিয়ে ‘অবৈধভাবেই’ ভারতে বসবাস এবং কাজকর্ম করছিলেন তারা।
বিবিসি বাংলার কলকাতা সংবাদদাতা অমিতাভ ভট্টশালী সীমান্তে গিয়ে দেখেছেন, কটি পরিত্যক্ত ঘরে অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য সীমান্তে জড়ো হওয়া মানুষদের। সেখান থেকে পুলিশ কর্মীরা একেকটি পরিবারকে ডেকে এনে নথি যাচাই করছেন। দেখা হচ্ছে তাদের বাংলাদেশের পরিচয়পত্র; লিখে নেওয়া হচ্ছে নাম, পরিচয়, বাংলাদেশের কোন জেলায় তার আদি বাড়ি ছিল – এই সব তথ্য। তোলা হচ্ছে ছবিও।
এরপরে তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে সীমান্ত চৌকি লাগোয়া জায়গায়। তাদের কীভাবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন বা বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেনি। কিন্তু সীমান্ত অঞ্চলের ভারতীয় গ্রাম হাকিমপুরের বাসিন্দারা বলছেন, তারা সবটাই দেখছেন।
এখন তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে অনেককে নাকি বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
বিবিসি বাংলা গত বুধবার যেদিন হাকিমপুরের সীমান্ত চৌকিতে গিয়েছিল, সেদিনও ওই একই পদ্ধতিতে নথি যাচাইয়ের পরে অপেক্ষা করতে বলা হয় বাংলাদেশে যারা চলে যেতে চান, তাদের।
তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের সেখানেই অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়। এরপর তাদের বাসে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় স্বরূপনগর থানা এলাকাতে গড়ে তোলা ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক শিবিরগুলোয়। তবে এর আগের কয়েকদিন অনেকে রাতের বেলা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে চলে গেছেন বলে স্থানীয় সাংবাদিকরা দাবি করেছেন।

ছবি: বিবিসি নিউজ বাংলা
সীমান্তের ভারতীয় অংশে যখন এমন প্রেক্ষাপট, তখন বাংলাদেশ অংশে কী অবস্থা?
ভারতের হাকিমপুর সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কাকডাঙ্গা সীমান্ত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীমান্তের ওপারে নানা ঘটনাক্রম থাকলেও এপারে তার আঁচ খুব একটা লাগেনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা। তারা বলছেন, গত মঙ্গলবার ওই সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের ঘটনা নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও এরপর নতুন করে কিছু ঘটেনি। ভারত থেকে সীমান্ত পার হয়ে শত শত কথিত বাংলাদেশির প্রবেশের কোনো তথ্যও তারা পাননি।
সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী কেড়াগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন হাবিল বলছেন, ভারতের হাকিমপুরে অবৈধ বাংলাদেশি পরিচয়ে অনেক মানুষের জড়ো খবর থাকলেও বাংলাদেশ অংশে এ নিয়ে এখনও কোনো উত্তেজনা নেই।
‘আমি শুনছি যে হাকিমপুরে বাংলাদেশের লোক এক জায়গা করছে সব, কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ঢুকছে বলে খবর পাইনি,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন হাবিল।
সীমান্ত এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে বলেই জানান সাতক্ষীরার একাধিক গণমাধ্যমকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও।
কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম শাহীন বলছেন, সীমান্তের ওপার থেকে নানা খবর পাওয়া গেলেও বাংলাদেশ অংশে এ নিয়ে এখনও তেমন কোনো উত্তেজনা নেই।
‘মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা জেনেছি যে ওপারে মানুষ জড়ো করা হয়েছে, কিন্তু সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থায় আছে, আমরাও থানা এলাকায় নজরদারি জোরদার করেছি,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
ভারত থেকে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি পরিচয়ে কাউকে হস্তান্তর করা হয়েছে, এই তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘গত রাতেও বিজিবির যিনি এখানে অধিনায়ক তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, ওপার থেকে পুশ ইন এর চেষ্টা হয়েছিল, তবে তারা সফল হয়নি। বাংলাদেশ প্রান্তে বিজিবি সতর্ক আছে।’
সাতক্ষীরার পাশেই ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশের আরেক জেলা যশোরের সীমান্ত এলাকায়ও অবৈধ অনুপ্রবেশ বা জোর করে কাউকে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনা ঘটেনি।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ‘সীমান্তে ভারত থেকে বাংলাদেশে জোর করে বা আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে পাঠানো হয়েছে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
এছাড়া রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেও সীমান্ত এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে বলেই জানা গেছে। চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জানিয়েছে, সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই, এরকম কাউকে বিজিবি হস্তান্তরও করেনি।
তবে অবৈধভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টার সময় গত বুধবার দুইজন নারীকে আটক করে পুলিশে হস্তান্তর করেছে ঝিনাইদহ বিজিবি।
(প্রতিবেদনটি বিবিসি নিউজ বাংলা থেকে নেওয়া এবং কিছুটা সংক্ষিপ্ত)
এনএনবাংলা/
