



বিদ্যুৎ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আধুনিক জীবনে বিদ্যুৎ ছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন।
একটি দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেকটাই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হল বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিলেই এর সবচেয়ে বেশি চাপ গিয়ে পড়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর। প্রশ্ন উঠছে, লোডশেডিং মানেই কেন শুধু গ্রাম?
সাম্প্রতিক প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ সময়ের তাপপ্রবাহ এবং বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন এলাকার মানুষ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকছেন। অনেক এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ।
গ্রামের একজন শিক্ষার্থীর কথা ভাবুন তো। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষার্থীরা ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। মন দিয়ে একজন কৃষকের কথাও ভাবুন। সেচের জন্য বিদ্যুৎ না থাকলে ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, দোকানদার মূলত সবাই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। হাসপাতালেও অনেক সময় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। অর্থাৎ বিদ্যুতের সংকট শুধু ঘর অন্ধকার করে না, এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, বিদ্যুৎ বণ্টনে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিদ্যুতের সংকট হলে কেন গ্রামের মানুষকেই বেশি সময় অন্ধকারে থাকতে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। গ্রামের মানুষও এই দেশের নাগরিক। তাদেরও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এই ক্ষোভের কারণ শুধু বিদ্যুৎ না থাকা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং বৈষম্যের অনুভূতি। যখন একজন শহরের নাগরিক তুলনামূলক কম সময় বিদ্যুৎ সমস্যায় ভোগেন আর গ্রামের মানুষ দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকেন, তখন বৈষম্যের প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক।
আমাদের দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, এসব কারণে এই খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখন সাধারণ মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। কিন্তু অতীতের ভুল নীতির দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করছি।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু সাময়িক সমাধান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমাতে হবে। কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে যখন দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ তার সুফল সমানভাবে ভোগ করবে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে শুধু রাষ্ট্রের সংকটের সময় মনে করলে চলবে না; তাদের প্রয়োজন ও অধিকারকে সবসময় সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
লোডশেডিং একটি বাস্তব সমস্যা এবং এর সমাধানও হতে হবে ন্যায়সঙ্গতভাবে। গ্রাম মানেই বেশি লোডশেডিং এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মনে রাখা জরুরি বিদ্যুৎ কোনো বিশেষ শ্রেণির সুবিধা নয়। এটি দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকার।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষক।
*মতামত লেখকের নিজস্ব।
Tags: load sheddingলোডশেডিং মানেই কেন গ্রাম
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন