



মালয়েশিয়া ও চীনে উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে গত ২৬ জুন দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফর কেবল চিরাচরিত আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাংলাদেশের ‘পূর্বমুখী কূটনীতি’র এক নবদিগন্তের উন্মোচন করেছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের শ্রমবাজার সম্প্রসারণের আশাবাদের পাশাপাশি, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ককে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যেতে বেশ কিছু যুগান্তকারী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘দুই যোগ দুই’ (২+২) নীতি অনুসরণ, তিস্তার পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনা এবং বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে এসব দ্বিপক্ষীয় সাফল্যের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ কেড়েছে যে বিষয়টি, তা হলো চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংযোগপথের প্রস্তাব।
সংযোগপথের ভূরাজনৈতিক রূপরেখা ও বিপুল সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক সংযোগপথ মূলত চীনের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার এক সুবিশাল পরিকল্পনা। চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত ১,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যে অর্থনৈতিক পথটি বর্তমানে চালু রয়েছে, সেটিকে বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা গেলে এর কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে এই উদ্যোগটি ‘বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক সংযোগপথ’ নামে প্রস্তাবিত হয়েছিল। কিন্তু চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের কৌশলগত নিরাপত্তা নিয়ে নয়াদিল্লির নিজস্ব শঙ্কা থাকায়, ভারত ক্রমশ নিজেকে এই প্রকল্প থেকে গুটিয়ে নেয়। তবে বাংলাদেশ তার ধারাবাহিক অর্থনৈতিক স্বার্থে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
এই সংযোগপথের বাস্তবায়ন ঘটলে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের পণ্যসামগ্রী অত্যন্ত স্বল্প সময়ে স্থলপথে সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে পৌঁছাতে পারবে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি অভাবনীয় শক্তির ভিত্তি পাবে। ত্রিদেশীয় পরিবহন যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠার পাশাপাশি বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের যে অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, প্রস্তাবিত এই পথ সেই উদ্যোগকে পূর্ণতা দেবে। একইসঙ্গে, মোংলা বন্দর এবং এর পার্শ্ববর্তী বৃহত্তর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতেও এই সংযোগপথ নবপ্রাণের সঞ্চার করবে। মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে আমদানি-রপ্তানি ও পণ্য পরিবহন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে; যার ফলে খুলনাসহ সংলগ্ন এলাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপক প্রসার ঘটবে এবং নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। ওই জনপদে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আর্থসামাজিক চিত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। ফলে মোংলা আর কেবল একটি বিকল্প বন্দর হিসেবে থাকবে না, বরং তা আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট: একটি দুর্লঙ্ঘ্য বাধা?
সম্ভাবনার ওই উজ্জ্বল চিত্রের বিপরীতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয়। প্রস্তাবিত সংযোগপথটি মূলত যে রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাবে, সেখানে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার কর্তৃত্ব বর্তমানে চরম সংকটের মুখে। দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি যে আর জান্তা সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে নেই, তা আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। খোদ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, জান্তা সরকার বর্তমানে মিয়ানমারের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও বলছে, ‘আরাকান আর্মি’ নামের সশস্ত্র গোষ্ঠী দেশটির ১৪টি রাজ্যের ১৭টি শহরে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনকি জান্তা সরকার গ্যাস সরবরাহ করতে না পারায় সেখানে চীনের বিনিয়োগকৃত একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজও বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
অন্যদিকে, এই রাখাইন রাজ্য থেকেই শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে; যাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের কোনো অনুকূল পরিবেশ এখনও দৃশ্যমান নয়। ঠিক এমন এক জটিল, অস্থিতিশীল ও স্পর্শকাতর প্রেক্ষাপটেই চীন নতুন করে সংযোগপথের প্রস্তাবটি সামনে এনেছে। তাই গত ২৭ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গেই জানিয়েছেন যে, সরকার তড়িঘড়ি করে কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি; বরং প্রস্তাবটির সব দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখছে।
যেহেতু প্রস্তাবিত পথটি রাখাইনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তাই বাংলাদেশকে স্বভাবতই আঞ্চলিক যোগাযোগের এই বিষয়টিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। চীনের কার্যকর ও আন্তরিক মধ্যস্থতায় এই সংকটের রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব হলে ত্রিদেশীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আর বড় কোনো অন্তরায় থাকবে না। তবে বর্তমানের এই সাময়িক বাধাগুলো থাকলেও, দূরপ্রসারী এই পরিকল্পনার ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
জাতীয় নিরাপত্তা ও ‘২+২’ কাঠামোর কৌশলগত ঢাল
বিশ্বায়নের এই যুগে চীন আমাদের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের ওপর নয়াদিল্লি ও বেইজিং উভয়েরই কৌশলগত প্রভাব অনস্বীকার্য। তবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের যে সাহসী বার্তা প্রধানমন্ত্রী তাঁর চীন সফরের মাধ্যমে দিয়েছেন, তা দেশের সচেতন মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ‘২+২’ কাঠামোর সূচনা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত ঢাল হিসেবে কাজ করবে—
বহুমুখী কূটনীতিই আগামীর পাথেয়
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে সুদৃঢ় বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি শক্তিশালী বলয় হিসেবে কাজ করবে। সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ জটিল সমীকরণে আবদ্ধ। ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয়’ কৌশলগত অংশীদার, অন্যদিকে ব্রিকস-এর সদস্য হিসেবে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে মিলে বিশ্ব বাণিজ্যে ডলার-নির্ভরতা হ্রাসের সমান্তরাল নীতি নিয়ে চলছে। ভৌগোলিকভাবে দূরে হলেও বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কিংবা এই অঞ্চলে রাশিয়ার সুপ্ত উপস্থিতি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের অর্থনীতির নাড়ির টান রয়েছে এবং জাপান, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে রয়েছে পরীক্ষিত বন্ধুত্ব। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আত্মিক ও বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বজায় রাখাও আমাদের জন্য অপরিহার্য।
তাই ভূরাজনৈতিক এই ভারসাম্য রক্ষায় কোনো একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল না হয়ে বা ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে না রেখে’ বরং চীনের মতো পরীক্ষিত মিত্রকে পাশে রেখে, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমুখী কূটনীতির যে পথে বাংলাদেশ অগ্রসর হচ্ছে, আগামী দিনের জটিল বিশ্ব সমীকরণে সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক ও ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশন -এর উপদেষ্টা সম্পাদক।
Tags: চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশচীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগপ্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানবাংলাদেশের পূর্বমুখী কূটনীতি
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন