Skip to content

Upcoming
Portugal
0-0
Spain
Source: ESPN

জুলাইয়ের অঙ্গীকার রক্ষার লড়াই: রাষ্ট্র, সমাজ ও ভবিষ্যতের দায়

গণঅভ্যুত্থান কোনো গন্তব্য নয়; এটি একটি নতুন যাত্রার সূচনা। ইতিহাসের প্রতিটি সফল গণআন্দোলনের পর সবচেয়ে কঠিন কাজটি শুরু হয়—একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। আন্দোলনের উত্তাপ একসময় স্তিমিত হয়, কিন্তু তখনই সামনে আসে প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন এবং নাগরিক আস্থা পুনরুদ্ধারের কঠিন বাস্তবতা। বাংলাদেশের বর্তমান সময়ও সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই অতিক্রম করছে।

জুলাইয়ের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ। এখানে কোনো একক রাজনৈতিক দলের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না; বরং নানা মত, পথ ও আদর্শের মানুষ একটি অভিন্ন দাবিতে একত্রিত হয়েছিল। এই বৈচিত্র্যই ছিল আন্দোলনের নৈতিক শক্তি। তাই আন্দোলনের পর যদি কোনো একক গোষ্ঠী এই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব কিংবা উত্তরাধিকার নিজেদের একচেটিয়া সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তা জুলাইয়ের অন্তর্নিহিত চেতনার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।

গণআন্দোলনের পরে প্রায়ই একটি প্রবণতা দেখা যায়- কেউ ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে লিখতে চায়, আবার কেউ পুরো আন্দোলনকেই ব্যর্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করে। দুটি প্রবণতাই গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ইতিহাসকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সত্য, তথ্য ও বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।

আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো মব সংস্কৃতি। আইনকে পাশ কাটিয়ে জনতার একটি অংশ যদি নিজেরাই বিচারক ও শাস্তিদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তবে রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচার আদালত করবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তদন্ত করবে- এটাই সভ্য রাষ্ট্রের নিয়ম। নচেৎ ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

একইভাবে ধর্মের প্রশ্নেও আমাদের সংযমী ও দায়িত্বশীল হতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ। কিন্তু ধর্মপ্রাণ হওয়া এবং সাম্প্রদায়িক হওয়া এক বিষয় নয়। এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে ইসলাম যেমন বিকশিত হয়েছে আধ্যাত্মিকতা, মানবিকতা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে, তেমনি এখানকার সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে বহু ঐতিহ্যের সম্মিলনে। ফলে ধর্মকে যদি রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার বা সামাজিক বিভাজনের উপকরণে পরিণত করা হয়, তাহলে ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একইভাবে সংস্কৃতিকে ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোও ভুল। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, লোকসংগীত, বাউল, মরমি ধারা, মাজারকেন্দ্রিক লোকঐতিহ্য কিংবা ধর্মীয় অনুশীলন- এসব নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা বহুস্তরীয়। কোনো মত বা চর্চার সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে, কিন্তু সেই দ্বিমত প্রকাশের পথ হতে হবে আইনসম্মত, শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিনির্ভর। সহিংসতা, ভয়ভীতি বা সামাজিক বর্জন কখনোই সমাধান হতে পারে না।

অন্যদিকে, যারা অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমালোচনা করেননি, কিন্তু বর্তমানের প্রতিটি সংকটকে সামনে এনে পুরো গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করতে চান, তাঁদের অবস্থানও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর উদ্ভূত সমস্যাগুলো বাস্তব হতে পারে; কিন্তু সেগুলোর অস্তিত্ব দিয়ে অতীতের সব অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া যায় না। একইভাবে বর্তমানের ভুলত্রুটি দেখিয়ে ভবিষ্যতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশের রাজনীতিকে এখন প্রতিশোধের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে সংস্কৃতি একসময় বিরোধী মতকে দমন করেছে, সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি অন্য কারও হাতে হলেও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ব্যক্তি বদলালেই যদি পদ্ধতি না বদলায়, তাহলে গণঅভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যাবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নারীর স্বাধীন চলাচল, মতপ্রকাশের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ব নিশ্চিত করা- এসব কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি অনুগ্রহ নয়; এগুলো সংবিধানসম্মত নাগরিক অধিকার। রাষ্ট্র যদি এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সমাজে অবিশ্বাস বাড়বে।

জুলাইয়ের আন্দোলনের আরেকটি শিক্ষা হলো- তরুণ প্রজন্মকে অবহেলা করা যায় না। তারা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নৈতিক নেতৃত্বও প্রত্যাশা করে। তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে হতাশা আবারও নতুন অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান- দুটোরই একটি মৌলিক মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে ছিল মর্যাদা, অধিকার এবং বৈষম্যহীন সমাজ। তাই স্বাধীনতার চেতনা এবং জুলাইয়ের চেতনাকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর পরিবর্তে, উভয়ের অভিন্ন মূল্যবোধকে সামনে আনা প্রয়োজন।

আজ প্রয়োজন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কোনো নারী তার পোশাকের কারণে অপমানিত হবেন না; কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু তার বিশ্বাসের কারণে আতঙ্কে থাকবেন না; কোনো মুসলমান তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিদ্বেষের শিকার হবেন না; কোনো সাংবাদিক সত্য লেখার কারণে ভয় পাবেন না; কোনো শিক্ষক, শিল্পী বা গবেষক স্বাধীনভাবে চিন্তা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করবেন না।

এমন বাংলাদেশই ছিল জুলাইয়ের স্বপ্নের অন্যতম ভিত্তি- একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

আমরা যদি সত্যিই সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চাই, তাহলে আমাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সহনশীলতার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ কোনো জাতি কেবল শাসক পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলায় না; বদলায় তার মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে।

জুলাই আমাদের একটি সুযোগ দিয়েছে। সেই সুযোগকে আমরা বিভাজনের রাজনীতিতে হারিয়ে ফেলব, নাকি একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করব- এই সিদ্ধান্ত আজ আমাদেরই নিতে হবে।

ইতিহাস একদিন এই সময়ের বিচার করবে। তখন মানুষ হয়তো দেখবে, আমরা শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলাম, নাকি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণের পথে হাঁটতে পেরেছিলাম। সেই উত্তর নির্ভর করছে আজকের আমাদের প্রজ্ঞা, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার ওপর।

লেখক: কবি, গল্পকার ও কলামিস্ট।

*মতামত লেখকের নিজস্ব।