Skip to content

Upcoming
Portugal
0-0
Spain
Source: ESPN

জনগণের মাঝে বেড়ে উঠা চীনের কমিউনিস্ট পার্টি

১ জুলাই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের যাত্রার দিকে ফিরে তাকানোরও একটি উপলক্ষ বটে।

১৯২১ সালে সাংহাইয়ের একটি শিকুমেন (পাথরের দরজা সম্বলিত) বাড়িতে বিপ্লবীদের এক ক্ষুদ্র সমাবেশ থেকে বিশ্বের বৃহত্তম শাসক দল হয়ে ওঠা পর্যন্ত সিপিসি সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতীক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং ছিল পুনর্জীবনের ইতিহাস।

রাজনৈতিক দল হল একটি জীবন্ত সত্ত্বা। রাজনৈতিক দলের জীবনীশক্তি শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছ থেকেই আসে। ঠিক যেমন একটি জীবদেহ বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের উপর নির্ভর করে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া রাজনৈতিক দল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হারিয়ে যায়। তবে সিপিসি’র অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। প্রতিষ্ঠার এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও, এটি জনগণের কাছ থেকেই তার বৈধতা, শক্তি এবং প্রাণশক্তি অর্জন করে চলেছে।

চীনের ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়ে দলটির জন্ম হয়েছিল। ১৮৪০ সালের আফিম যুদ্ধের পর চীন ক্রমান্বয়ে একটি আধা-ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক সমাজে পরিণত হয়। বিদেশী আগ্রাসন, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা চীনা জাতিকে এক শতাব্দীর অপমানের শিকার করেছিল। পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এবং মানব অগ্রগতিতে বিপুল অবদান রাখা একটি সভ্যতা তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে বাধ্য হয়েছিল।

এই সময়কালে, অগণিত দেশপ্রেমিক জাতিকে রক্ষার উপায় খুঁজেছিলেন। তাইপিং স্বর্গীয় রাজ্য আন্দোলন, ১৮৯৮ সালের সংস্কার আন্দোলন, ইহেতুয়ান আন্দোলন এবং ১৯১১ সালের বিপ্লব—এই সবগুলোই চীনের পতন রোধ করার চেষ্টা করেছিল। তাদের মহৎ উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও, এই প্রচেষ্টাগুলো দেশের ভাগ্যকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে চীনে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আগমনের পর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং চীনা জনগণকে নিপীড়ন ও বিদেশি আধিপত্য থেকে মুক্ত করার দৃঢ় সংকল্পে চালিত হয়ে, চেন দুশিউ, লি দাজাও, মাও সে-তুং, দং বিউ, হে শুহেং, ওয়াং জিনমেই এবং দেং এনমিং সহ একদল অগ্রদূত ১৯২১ সালের জুলাই মাসে সাংহাইয়ের একটি সাধারণ শিকুমেন বাড়িতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

পরবর্তী দশকগুলোতে চীনা কমিউনিস্ট প্রজন্মগুলো জাতীয় পুনরুজ্জীবনের এই লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মাও সে-তুং চীনা বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং নতুন চীনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। চৌ এনলাই, লিউ শাওচি, ঝু দে, চেন ইউন এবং অন্যান্য প্রবীণ বিপ্লবীরা গণপ্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও সুসংহতকরণে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন।

সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি প্রবর্তনের পর দেং জিয়াওপিং চীনকে অর্থনৈতিক রূপান্তর ও আধুনিকীকরণের পথে চালিত করেন। চিয়াং জেমিন ও হু জিনতাও সহ পরবর্তী নেতারা দেশটিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্ব অর্থনীতির সাথে গভীরতর একীকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচালনা করেন।

আজ, শি চিনপিং-এর নেতৃত্বে চীন সর্বক্ষেত্রে একটি মহান আধুনিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার এবং জাতীয় পুনরুজ্জীবনের চীনা স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য অনুসরণ করছেন।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগে নেতৃত্বের পরিবর্তন সত্ত্বেও, পার্টি তার প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্যে অবিচল থেকেছে; চীনা জনগণের সুখ অন্বেষণ এবং চীনা জাতির পুনরুজ্জীবন—উদ্দেশ্যের এই ধারাবাহিকতাই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১০৫ বছরের যাত্রাপথের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

শুরু থেকেই দলটি জনগণকে কেন্দ্র করে তার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এটি কেবল জাতীয় স্বাধীনতাই নয়, সাধারণ নাগরিকদের কল্যাণ ও সুখও কামনা করেছিল। জাতীয় পুনরুজ্জীবনের সাধনা এবং জনগণের কল্যাণ সাধনা অবিচ্ছেদ্য লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল।

সংগ্রামের মাধ্যমেই দল ও জনগণের মধ্যে বন্ধন গড়ে উঠেছিল। উত্তরাঞ্চলীয় অভিযান, কৃষি বিপ্লবী যুদ্ধ, জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় লক্ষ লক্ষ চীনা জনগণ দলের সমর্থনে সমবেত হয়েছিল।

তাঁরা সম্মিলিতভাবে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তাঁদের প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশটির আধা-ঔপনিবেশিক অবস্থার অবসান ঘটায় এবং চীনা ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

নয়া চীনের প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্র ও তার নাগরিকদের মধ্যকার সম্পর্ককে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছিল। আধুনিক চীনা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনগণ তাদের নিজেদের দেশের প্রভু হয়ে ওঠে। জাতীয় স্বাধীনতা চীনকে একটি ভিত্তি প্রদান করে, যার উপর নির্ভর করে চীন ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও পুনরুজ্জীবন গড়ে তোলে। বিনির্মাণ, সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের ধারাবাহিক পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে চীন মানব ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক পরিবর্তনের পথে যাত্রা শুরু করে।

সম্ভবত দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্যের চেয়ে জনগণের সঙ্গে দলের সংযোগ আর কোনো অর্জনই এত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে না। বিগত চার দশকে চীন প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে, যা একই সময়ে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য হ্রাসের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। চরম দারিদ্র্যের নির্মূল এবং সর্বক্ষেত্রে একটি মধ্যম সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার লক্ষ্য অর্জন, আধুনিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়।

রাষ্ট্রপতি শি চিনপিং প্রায়শই উল্লেখ করেছেন যে, দলের মূল, প্রাণশক্তি এবং শক্তির উৎস হলো জনগণ। শি বলেছেন, ‘চীনের সাফল্য দলের ওপর নির্ভরশীল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া কোনো নতুন চীন বা জাতীয় পুনরুজ্জীবন সম্ভব হতো না। এই দল ইতিহাস ও জনগণের দ্বারা নির্বাচিত।’

এই দর্শনটি সিপিসি’র একটি দীর্ঘস্থায়ী নীতিকে প্রতিফলিত করে; দলটির অস্তিত্ব জনগণের সেবা করার জন্য, নিজের বিশেষ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সিপিসি প্রাণবন্ত থাকার অন্যতম কারণ হলো এর সংস্কার ও আত্মসংশোধনের সদিচ্ছা। আত্ম-পর্যবেক্ষণের এই ক্ষমতা এটিকে অনিশ্চয়তার সময়গুলো অতিক্রম করতে এবং উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি সাড়া দিতে সাহায্য করেছে।

চীনের জাতীয় পুনরুজ্জীবনের বাইরেও, সিপিসি সার্বভৌমত্ব, উন্নয়নের পথ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধার উপর ভিত্তি করে মানবজাতির জন্য একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনের প্রচার করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, এটি অভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, উন্নয়নের ব্যবধান হ্রাস, সভ্যতার মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া জোরদার করা এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও সমতাপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করার লক্ষ্যে বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ, বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ, বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক শাসন উদ্যোগের মতো চারটি কাঠামোকে এগিয়ে নিয়েছে।

আজ, ১০ কোটিরও বেশি সদস্য এবং ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্বের বৃহত্তম শাসক দল হিসেবে রয়েছে। বিগত ১০৫ বছরে দলটি যুদ্ধ, বিপ্লব, অর্থনৈতিক সংকট এবং জটিল সংস্কার দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছে। তবুও সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে; দল জনগণকে ভোলেনি, এবং জনগণও দলকে ভোলেনি।

লেখক: ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশন -এর ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্ট।