Skip to content

Upcoming
Croatia
0-0
Ghana
Source: ESPN

বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগের সাফল্য দেখতে চাই

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বন্ধ ও অলাভজনক শিল্পকারখানা চালু করার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। ২০ জুন এরকম একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এ বৈঠকে জাপানের একাধিক করপোরেশনের প্রতিনিধি ও দূতাবাসের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ তৈরি করা। সমস্যা আছে, চ্যালেঞ্জ আছে; কিন্তু একসঙ্গে চেষ্টা করলে বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।

আমরা সবাই জানি, পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় পূর্ববঙ্গ দুর্বল শিল্পভিত্তি নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তবুও ইতিবৃত্তে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে উল্লেখযোগ্য ভারী শিল্প গড়ে না উঠলেও বেশকিছু হালকা শিল্প গড়ে উঠেছিল। এসব শিল্প মূলত ঢাকার তেজগাঁও ও এর পার্শ্ববর্তী টঙ্গী এলাকায় গড়ে ওঠে। এসব শিল্পকারখানার মধ্যে ছিল বস্ত্র, ওষুধ, সাবান, বিস্কুট ও হালকা প্রকৌশল শিল্প। হাজারীবাগে চামড়া প্রক্রিয়াজাত এলাকা হিসাবে গড়ে ওঠে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর দুই তীরে ডেমরা ও কেরানীগঞ্জে এবং শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জে গড়ে ওঠে একাধিক পাটকল। নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিলস ছিল এশিয়ার সর্ববৃহৎ জুট মিল। এছাড়া ঢাকার অদূরে জয়দেবপুরে একটি মেশিন টুলস কারখানা গড়ে তোলা হয়।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ, উত্তর পতেঙ্গা, ফৌজদারহাট ও কালুরঘাট এলাকায় কিছু ভারী শিল্প গড়ে ওঠে। এর মধ্যে উত্তর পতেঙ্গার চিটাগাং স্টিল মিলস ছিল বিখ্যাত। এছাড়া ষোলশহর, সীতাকুণ্ড ও রাঙ্গুনিয়ায় কিছু জুট মিল গড়ে উঠেছিল। এছাড়াও চট্টগ্রামে অনেক হালকা শিল্পও গড়ে উঠেছিল।

এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর খুলনার রূপসা, খালিশপুর, দৌলতপুরও শিল্পাঞ্চল হিসাবে একটা পরিচিতি পায়। খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলও ছিল আকারে বিশাল। বস্তুত ৭২টি জুট মিল, ১৫টি কাপড়ের কল, ১১টি চিনিকল, ১টি মেশিন টুলস কারখানা, ২টি কাগজের কল ও ১টি নিউজপ্রিন্ট মিল, আর কিছু হালকা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে গড়ে উঠেছিল আমাদের একাত্তর-পূর্ব শিল্পভিত্তি। শিল্প বিকাশের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমরা যদি শিল্প ঐতিহ্যের বিস্তার ঘটাতে পারতাম, তাহলে আজ বাংলাদেশ হতো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শিল্পোন্নত দেশ। আমরা সেটা কেন পারিনি, এর কিছুটা হলেও নির্মোহ বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। আমরা নতুন করে যাত্রা শুরু করেছিলাম ১৯৭২ সালে। সে অভিযাত্রা ছিল সমাজতন্ত্রের অভিমুখে। এ সময়ে অবাঙালি মালিকানায় পরিচালিত পরিত্যক্ত কলকারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করার যৌক্তিকতা বা বাধ্যবাধকতা দেখা দিয়েছিল। আর সেসবের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গিয়ে পড়েছিল আমলাদের ওপর। ওইসব কলকারখানা পরিচালনা কিংবা ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে তাদের পূর্বধারণা বা অভিজ্ঞতা বলতে কিছু ছিল না। তবুও হয়তো ভুল করে শেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গনে অদ্ভুত একটা প্রবণতা লক্ষ করা করা গেল। রুশপন্থি কমরেডরা অপুঁজিবাদী বিকাশের একটা অভিনব তত্ত্ব হাজির করলেন এবং ব্যাংক-বিমা-শিল্পকারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করার অনুকূল বয়ান তৈরি করা শুরু করলেন। তারা ভাবলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিলে সমাজতন্ত্র কায়েম করা সহজ হবে। তারা লাভ-লোকসানের বিষয়টি উপেক্ষা করলেন এবং আর একশ্রেণির নব্য সমাজতন্ত্রী তখন রাজনীতিতে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্লোগান তুলে হাওয়া গরম করে তুললেন। অর্থনীতিতে ব্যক্তি উদ্যোগের যে সুবর্ণ সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা সাময়িকভাবে আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। শ্রমজীবী মানুষের শ্রমে ও ঘামে গড়ে ওঠা কলকারখানাগুলো আমলারা কতটা দক্ষতা ও সততা নিয়ে পরিচালনা করে ব্যর্থ হলেন, সেটা কেউ খতিয়ে দেখলেন না। লাভ-লোকসানের বিষয়টি নিয়ে কোনো পরিদর্শন বা তদন্ত করা হলো না। এ বিষয়ে কোনো জবাবদিহিতার বালাই ছিল না। শিল্প বিকাশে সুস্থ ট্রেড ইউনিয়নের একটা ভূমিকা থাকে। কিন্তু কোথাও সুস্থ ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। শ্রমিকদের বাঁচার মতো মজুরি না দিয়ে কোথাও কি কখনো শিল্প বিকাশ হয়েছে? পরিত্যক্ত শিল্পকারখানা যদি শুরুতেই উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে দিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে আর যা-ই হোক, বছরের পর বছর দায়-দেনার বোঝা জনগণকে বহন করতে হতো না।

সে যাই হোক, বেসরকারিকরণ নীতি গ্রহণ করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। বস্তুত, রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন সংঘটিত হওয়ার পর অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া শুরু হয়। ব্যক্তিমালিকানায় ব্যাংক-বিমা কোম্পানি গড়ে তোলার সুযোগ উন্মুক্ত হয়। লোকসানে চলা কলকারখানা বিক্রি করতে ও লিজ দিতে দেখা যায়। ধীরে ধীরে ব্যক্তি মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও শক্তি বাড়তে থাকে। কিন্তু তাই বলে সরকারি করপোরেশনগুলো এখনো অবলুপ্ত হয়ে যায়নি। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য থেকে শুরু করে ব্যাংক-বিমা অনেক কিছু এখনো সরকার তথা আমলারা নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ২০ জুন শিল্পপতিদের যে বৈঠক হয়েছে, সেই বৈঠকেও দুটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা পাঁচটি সংস্থার চেয়ারম্যানরা তাদের কারখানাগুলোর চিত্র তুলে ধরেছেন। যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বিসিআইসি (বিসিআইসি), বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন (বিএসএফ আইসি), বাংলাদেশ ইস্পাত শিল্প করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশন (বিটিএমসি)।

আশার কথা, এখন বাংলাদেশের বেসরকারি খাত অনেক শক্তিশালী। পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, সিমেন্ট কারখানা, সিরামিক শিল্প, স্টিল ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প এখন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কয়েকটি শিল্প ও ব্যবসায়ী গ্রুপ এতটা শক্তিশালী যে তারাই অর্থনীতিকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষমতা রাখে। তারা অলাভজনক ও বন্ধ কলকারখানার হেফাজতে থাকা বিপুল জায়গা ও অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি লিজ নেওয়ার, এমনকি কিনে নেওয়ার মতো সামর্থ্য রাখে। প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্য উদ্যোগের সাফল্য দেখতে চাই।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক ও ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশন -এর উপদেষ্টা সম্পাদক।