



এইমাত্র টেলিভিশনে শুনলাম বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রাক্তন স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আজ সকালে (১২ জুলাই) ইন্তেকাল করেছেন। তিনি দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৯৫ বছর। তাঁর রাজনৈতিক জীবনও ছিল বর্ণাঢ্য। তাঁর রাজনীতির সমর্থক না হলেও আমি তাঁর বক্তৃতার একজন গুণমুগ্ধ শ্রোতা ছিলাম।
১৯৫২ সালে গঠিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ এর আহ্বায়ক এডভোকেট কাজী গোলাম মাহবুবের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘ভাষা আন্দোলন মিউজিয়াম’ ২০০৮ সালের ২২ মার্চ একটি স্মরণসভার আয়োজন করে। ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি তখন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার। আমিও অনুষ্ঠানের একজন নির্ধারিত বক্তা ছিলাম। প্রধান অতিথির বক্তৃতার সময়ে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আমার বক্তব্যের উদাহরণ টেনে অনেক বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেন। দু’একটি ক্ষেত্রে বেশ জোড়ালো প্রতিক্রিয়া জানান।
অনুষ্ঠানের পর চা পানের সময়ে তিনি আমাকে ডেকে তাঁর কাছে বসান এবং আমার সাথে একমত না হলেও তথ্যবহুল হওয়ার কারণে আমার বক্তৃতার প্রশংসা করেন। যাবার আগে তিনি তাঁর সঙ্গে আসা সহকারীর ব্যাগ থেকে বের করে নিজের লেখা একটি ছোট্ট বই আমাকে উপহার দেন, নাম ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’। বাসায় এসে বইটি এক নাগাড়ে পড়ে ফেলি এবং মুগ্ধ হয়ে যাই। আকারে ক্ষুদ্র হলেও বইটি আমাদের রাজনীতির ইতিহাসের একটি অতি মূল্যবান দলিল। আমি বইটির উপর একটি আলোচনা লিখে ফেলি যা প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পাদিত ‘লোকায়ত’ পত্রিকায় ছাপা হয়।
আমি পত্রিকার তিনটি কপি বিশিষ্ট ভাষা-আন্দোলন গবেষক এম আর মাহবুবের মাধ্যমে মাননীয় স্পিকারের কাছে পাঠিয়ে দেই। তিনি পড়ে পরদিনই আমাকে ফোন করে লেখাটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং আরও ১০ কপি পত্রিকা প্রেরণের অনুরোধ করেন। আমি আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের কাছ থেকে ১০ কপি এনে আবার পাঠিয়ে দেই। এর কয়েকদিন পর তিনি সম্ভব হলে ‘লোকায়ত’ পত্রিকার ঐ সংখ্যাটির আরও ২০ কপি পাঠাতে অনুরোধ করেন এবং একদিন তাঁর অফিসে যেতে বলেন। আমি আজিজ মার্কেট থেকে সংকলনটির ২০ কপি সংগ্রহ করে তাঁকে পাঠাই। কয়েক দিন পর অ্যাপয়েনমেন্ট করে জাতীয় সংসদ ভবনে তাঁর সাথে দেখা করি। লাঞ্চ খাওয়ানোর পরও তিনি আমাকে বেশ কিছু সময় আটকে রেখে গল্প করেন। আমি বুঝতে পারলাম তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী ও উঁচুমানের একজন রাজনীতিবিদ এবং এদেশের রাজনীতির এক বিশাল তথ্য ভান্ডার। এর পরও বেশ কয়েকবার তাঁর স্মৃতিচারণ শুনতে গিয়েছি।
এর মধ্যে একটি ঘটনার উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ১৯৫৭ সালের ৭ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিত কাগমারী সম্মেলনের কথা সকলেই জানেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আর তাঁর দল আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার সরকারের দায়িত্বে। সম্মেলনে সেন্টো-সিয়াটো সামরিক জোটে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি এবং মার্কিন-ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির জন্য মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয় যার পরিণতিতে কিছুদিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগে বিভক্তি আসে এবং ‘ন্যাপ’ এর জন্ম হয়। সোহরাওয়ার্দী কাগমারীতে বক্তৃতার পর হেলিকপ্টারে করে সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সলিমুল্লাহ মুসলীম হল’-এ অবতরণ করেন। উদ্দেশ্য ছাত্রদের সামনে তাঁর অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির সমর্থনে বক্তৃতা করা। এই একটি উদাহরণ থেকে বুঝা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সে সময় কি উঁচু মননশীলতা ধারণ করত। আজ যখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট বাণিজ্য, গণরুম ও নানা রকম সন্ত্রাসের খবর প্রকাশিত হয় তখন সেদিনের কথা স্মরণ করে রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’র উপেনের মত বলতে ইচ্ছে হয় “ভাবিলাম হায়, আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন”।
যা হোক আবার এস এম হলের ঘটনায় আসা যাক। জমির উদ্দিন সরকার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং মওলানা ভাসানীর সমর্থক, অর্থাৎ শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরোধী। তাঁর সমমনা কয়েকজন ছাত্র মিলে ঠিক করলেন সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতির জন্য তাঁরা সোহরাওয়ার্দীকে বিভিন্ন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবেন। প্রশ্ন তৈরি করা হল এবং ঠিক করা হল যে প্রথম কয়েকটি প্রশ্ন করবেন জমির উদ্দিন সরকার। তিনি তাঁর সহযোগীদের নিয়ে মঞ্চের সামনের দিকেই বসলেন। সোহরাওয়ার্দী বক্তৃতা শুরু করলেন। রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে, তুখোড় বক্তা সোহরাওয়ার্দী অনর্গল বলেই চলেছেন। এক সময়ে পিছন থেকে একজন অধৈর্য হয়ে জমির উদ্দিনের জামা টেনে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন সোহরাওয়ার্দীকে কেন কোন প্রশ্ন করছেন না। জমির উদ্দিন সরকার পিছন ফিরে তাকে ধমকের সুরে বললেন, ‘চুপ কর বেটা, আগে ইংরেজি শোন।”
এবারে জমির উদ্দিন সরকারের লেখা ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’ বইয়ের উপর একটু আলোকপাত করা যাক। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান বন্দুকের নলের মাথায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সারা দেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। সমস্ত রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা হয়। রাজনীতিবিদদের উপর শুরু হয় চরম নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা। দেশের ভিতরে সকল প্রকার রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দেশের এই চরম দুর্দিনে লন্ডনে কিছু সংখ্যক প্রগতিশীল ছাত্র বিদেশের মাটিতে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন শুরু করার উদ্যোগ নেন। এদের পাশাপাশি লন্ডনে প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রদেরও একটি গ্রুপ ছিল যারা ছিল পাকিস্তানের অন্ধ সমর্থক। দেশের বাইরে আইয়ুবের অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনের বিষয়টি আমাদের ইতিহাসে অনেকটাই অনালোচিত থেকে গিয়েছে। এ সম্পর্কেই ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’ বইটি রচনা করেছেন।
আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারীর পর পরই অর্থনীতির ছাত্র কবিরউদ্দীন ও জাকারিয়া খান চৌধুরীর উদ্যোগে লন্ডনে অবস্থানরত ছাত্ররা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের জন্য Committee for Restoration of Democracy in Pakistan নামে একটি কমিটি গঠন করেন। তাঁদের উদ্যোগে বক্তৃতা, বিক্ষোভ, শোভাযাত্রার পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরার জন্য Unhappy East Pakistan নামে একটি পুস্তিকা ছাপানো হয়। পুস্তিকাটির শত শত কপি ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করা হত। আইয়ুব খানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী একবার লন্ডনে যান এবং ছাত্রদের সামনে বক্তৃতা করেন। মোহাম্মদ আলীকেও এর একটি কপি দেয়া হয়।
তখন পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু ছাত্র উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেতে গমন করতেন। বেশির ভাগ ছাত্র ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য যেতেন। এ সকল ছাত্রদের থাকা খাওয়ার জন্য লন্ডনে ‘পাকিস্তান স্টুডেন্ট হোস্টেল’ নামে একটি ছাত্রাবাস ছিল। কিছু সংখ্যক বাঙালি ছাত্র পাকিস্তানের দখলদার আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণের বিষয়ে সোচ্চার হয়ে আলাদাভাবে একটি বাড়ি ভাড়া করেন। এটির নাম দেয়া হয় ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’ যেখানে শুধুমাত্র পূর্ব পাকিস্তানি ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। পূর্ব পাকিস্তানিরা যে পশ্চিম পাকিস্তানিদের থেকে আলাদা এবং একদিন যে সত্যি সত্যিই তারা আলাদা হয়ে যাবে এটি ছিল তারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
এটা যে সে সময়কার পরিস্থিতি বিবেচনায় কত বড় সাহসিকতাপূর্ণ কাজ তা ভাবতে অবাক লাগে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত ছাত্ররা এখানে বিনা ভাড়ায় বা নামমাত্র ভাড়ায় থাকার সুযোগ পেতেন। পূর্ব পাকিস্তানি ছাত্রদের থাকার জন্য আলাদা বাড়ির পরিকল্পনার বিষয়ে জমির উদ্দিন সরকার তাঁর বইয়ে লিখেছেন, “এই পরিকল্পনা কি করে বাস্তবায়ন করা যায়? প্রগতিশীল ছাত্রদের সভা আহ্বান করা হল সম্ভবত গাওয়ার স্ট্রিট মিলনায়তনে। একটা বাড়ি করতে পারলে কত সুবিধা এবং আমাদের সদ্যাগত পূর্ব পাকিস্তানিদের একটা আশ্রয়, প্রয়োজনে আমাদের সভা করার জন্য স্থায়ী জায়গা হবে, এই নিয়ে বহু বক্তৃতা। বাড়ি কেনার আগেই বাড়ির নাম দেয়া হল ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’।
অনেকেই বলেন It is a substitute of Pakistan students hostel. সে যাই হোক না কেন এটা যে আমাদের পূর্ব পাকিস্তানিদের উপকারে আসবে তাতে সকলেই একমত। দম মৌলা-এগিয়ে চল। যদিও বহুদিন হয়ে গেছে তবুও মনে পড়ে এটা যেন সেদিনের ঘটনা। বক্তৃতা করলেন বাদল রশীদ (ব্যারিস্টার), জাকারিয়া খান চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান, আবুল খায়ের খান, মওদুদ আহমেদ, আবিদ হোসেন, আমিনুজ্জামান সেন্টু, মনোয়ার হোসেন (কে এন এস), কবিরউদ্দীন আহমেদ, কাজী আমিনুল হক, শফিক রেহমান, শামসুল মোর্শেদ, আলমগীর কবীর, রিয়াজুল আলম, আব্দুর রব, আমি ও আরো অনেকে। কমিটি করা হল। পরে কমিটি পরিবর্ধন করে কিছু কিছু রেস্তোরাঁ মালিককে নেয়া হল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু প্রফেসর যারা লন্ডনে পিএইচডি করছিলেন তাঁরাও যোগ দিলেন। কিছু দিনের মধ্যেই বেশ কিছু চাঁদা উঠল। এবার বাড়ি কেনার পালা। তখন আমাদের ছাত্রদের মধ্যে যারা বাড়ির মালিক তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাদল রশীদ (ব্যরিস্টার), আবুল খায়ের খান (ব্যারিস্টার), এম এ রব (ব্যারিস্টার)। এদের উপর ভার দেয়া হয় বাড়িকেনার। কারণ বাড়ি কেনাবেচার ব্যাপারে তাঁদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে। সাথে পরামর্শ দিবেন গ্রীন মাস্ক রেস্তোরাঁর মালিক জনাব মান্নান সাহেব ও অন্যজন জনাব মিনহাজ উদ্দিন। জনাব মান্নান ও জনাব মিনহাজ উদ্দিন দু’জনই সিলেটের অধিবাসী। বহুদিন ধরে লন্ডনে আছেন। প্রবাসী বাঙালিদের তাঁরা ভালোভাবে জানেন। আমাদের মিটিং সাফল্যমন্ডিত করার ব্যাপারে চাঁদা তোলা ও লোক যোগাড় করে দেয়ায় তাঁদের দান অপরিসীম।
বাড়ি কেনা হল Arsenal Underground Station থেকে কিছুটা দূরে। ঘটা করে উদ্বোধন করা হল। অবিভক্ত পাকিস্তান আমলেই ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’-এর জন্ম হল। ইতিহাসে বিরল একটি অবিভক্ত দেশের একটি প্রদেশের প্রবাসী বাঙালিরা নিজেদের আশ্রয়স্থল স্থাপিত করল, পূর্ব পাকিস্তান জাতীয়তাবাদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হল। পূর্ব পাকিস্তানিরা বলা শুরু করল আমরা পূর্ব পাকিস্তানি। ক্রমে ক্রমে ভুলতে শুরু করল যে, পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের অংশ। পশ্চিম পাকিস্তানিদের টনক নড়ল। আর পূর্ব পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রদেরও টনক নড়ল। শেষে কি ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’ থেকে পূর্ব পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হবে” ( সূত্র: মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার, লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন, শাহজাহান প্রিন্টিং প্রেস, ফকিরাপুল, ঢাকা, ২০০৫, পৃষ্ঠা: ২৩-২৪)।
সোহরাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে ইন্তেকাল করেন। চিকিৎসার জন্য বৈরুতে যাওয়ার পথে তিনি কয়েক দিন লন্ডনে অবস্থান করেন। জমির উদ্দিন সরকার লিখেছেন যে সোহরাওয়ার্দী ’ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’ প্রতিষ্ঠাতাদের ভৎর্সনা করেন এবং তাঁদেরকে মওলানা ভাসানীর সমর্থক বলে অভিহিত করেন। এর কিছুদিন পর শেখ মুজিবুর রহমান ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’ পরিদর্শন করেন। শেখ মুজিবের ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউজ’ পরিদর্শন সম্পর্কে জমির উদ্দিন সরকার লিখেছেন, ‘‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন লন্ডনে এবং আমাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে শহীদের সাক্ষাৎ হয়ে গেছে। তারপর শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। আমাদের নেতৃবৃন্দের প্রতি শহীদের ব্যবহারে শেখ মুজিব মন:ক্ষুণ্ন হন। কারণ শেখ মুজিব আমাদের বিপক্ষ দলটিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকেই চিনতেন। ভালোভাবে জানতেন তারা আর যাই করুক পূর্ব পাকিস্তানের দাবী দাওয়া নিয়ে শহীদ ও মুজিবের সঙ্গে কোনদিন রাজনীতিতে সংগ্রাম করবে না।
জাকারিয়া খান চৌধুরী শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জাকারিয়া বলেন, শেখ মুজিব যখন ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর শেরে বাংলা ফজলুল হকের মন্ত্রীসভায় দুর্নীতি দমন মন্ত্রী ছিলেন, তখন জাকারিয়ার পিতা জনাব ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের মন্ত্রণালয়ে সেক্রেটারি হিসাবে কাজ করেন। সে সূত্রে জাকারিয়ার সঙ্গে জনাব শেখ মুজিবের পরিচয়। জাকারিয়া খান শেখ মুজিবকে বিস্তারিতভাবে বলেন, শহীদ কিভাবে তাদের সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করেছে? জাকারিয়া আরো অনুরোধ করেন জনাব শেখ মুজিব যাতে একবার ইস্ট পাকিস্তান হাউজে আসেন। জনাব শেখ মুজিব ইস্ট পাকিস্তান হাউজে যান এবং নেতৃবৃন্দের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, লন্ডনে ইস্ট পাকিস্তান হাউজ পূর্ব পাকিস্তানের দাবি দাওয়ার সংগ্রামে অংশীদার হবে এবং তিনি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন’’ (সূত্র: ঐ, পৃষ্ঠা: ২৯)।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুর সাথে সাথে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশাল স্তম্ভের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল। আমি তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক: প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক। ইমেইল: syedziabd@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব।
Tags: জমির উদ্দিন সরকার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনজাতীয় সংসদের প্রাক্তন স্পিকারব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন