



নওগাঁ যেন ভাঙ্গা-গড়ার শহর। এক রাজা থেকে আরেক সুলতান—এ নগরী শাসনের সুদীর্ঘ ইতিহাস আজও স্বীকৃত। নওগাঁর দিনলিপিতে এ শহরের সংস্কৃতি, শিক্ষা ও কৃষিজ সম্পদের অসাধারণ প্রতিচ্ছবি পরিস্ফূটিত হয়েছে। এ নগরীর যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি তার চ্যালেঞ্জও অনেক।
নওগাঁর নামের সাথে যেন লাবণ্য ও প্রাচুর্য্য লুকায়িত। পল্লীকবি পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘রাখাল ছেলে’ কবিতার প্রতিফলন যেন এ নওগাঁ শহর সুন্দরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তিনি তাঁর কবিতায় বলেন— ‘রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! বারেক ফিরে চাও, বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?’ ‘ওই যে দেখ নীল-নোয়ান সবুজ ঘেরা গাঁ; কলার পাতা দোলায় চামর শিশির ধোয়ায় পা; সেথায় আছে ছোট্ট কুটির সোনার পাতায় ছাওয়া,।’
বিভিন্ন শাসনামলে নওগাঁ জেলা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি ঐতিহাসিক নিদর্শন এখনও বিদ্যমান রয়েছে। মূলত মৌর্য, গুপ্ত, সেন, পাল এবং মুসলিম শাসনামলে এ অঞ্চল স্বতন্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিগণিত ছিল। মুসলিম শাসনামলে এ অঞ্চলটি ইসলামিক শিক্ষা কেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা নির্মাণে বিশেষভাবে অবদান রেখেছে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান শাসনামলে এ অঞ্চলে কৃষি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নওগাঁ জেলার মানুষ অসামান্য অবদান রেখেছে।
নওগাঁ জেলা শিক্ষা ও সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের শহর হিসেবে আখ্যায়িত। রাজশাহী যেমন সিল্ক, শিক্ষা ও সৌন্দর্যের শহর হিসেবে খ্যাত, তেমনি নওগাঁ প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন, ঐতিহ্য, কৃষি শস্য ও আমের প্রাচুর্য্য এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারণে নিজেকে রাজশাহী বিভাগের স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে সমাদৃত করেছে।
বরেন্দ্র হিসেবেও এ অঞ্চলের মাটি, ভূ-প্রকৃতির গঠন, কৃষিজ পণ্য ও সবুজ মাঠের কারণে আলাদা গুরুত্ব বহন করেছে। বরেন্দ্র অঞ্চল মূলত রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, বৃহত্তর নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, পাবনার কিছু অংশ, রংপুর বিভাগের রংপুর এবং দিনাজপুর জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। এছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলের কিছু অংশ ভারতের উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদা জেলার অধিকাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত। বাংলাদেশের প্রায় ৮,৭২০ কি.মি. নিয়ে বরেন্দ্র বিস্তৃত রয়েছে। ফলত, এ অঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং এ সকল অঞ্চল নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যে কোন প্রকার ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে। কারণ খাদ্য-নিরাপত্তা নন ট্রেডিশনাল সিকিউরিটি বা অপ্রচলিত নিরাপত্তা হিসেবে আখ্যায়িত। এ অঞ্চল নিয়ে কোন ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রের উস্কানীমূলক বক্তব্য গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে কৌশলগত দিক নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের উস্কানি কিংবা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অন্যদিকে এ অঞ্চলের উন্নয়ন, কৃষিজ সম্পদের দেখভাল ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে সরকার, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কৃষি মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি অনুষদ ও কৃষি ইন্সটিটিউট জাতীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এ ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে নয়টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তন্মেধ্যে রাজশাহী ও রংপুরে উভয় বিভাগের জন্য শুধুমাত্র কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (২০২১) স্থাপিত হয়েছে। যদিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদ রয়েছে।
রাজশাহী শহরে সরকারি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, মেডিকেল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও নওগাঁতে এতদিন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। সম্প্রতি নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় (২০২৩) যাত্রা শুরু করেছে। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. হাছনাত আলী, যার রয়েছে ২৫ বছরের শিক্ষকতার ক্যারিয়ার।
যুমনা নদী (ছোট) নওগাঁ শহরটিকে দুভাগে বিভক্ত করেছে। এটাকে ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিউবের সাথে তুলনা করা যায়। হাঙ্গেরির রাজধানীকে দানিউব নদী বিভক্ত করেছে। তবে ইউরোপের মত নওগাঁ কৃত্রিম সৌন্দর্যে আবৃত নয়। নওগাঁ শহর ও পাশ্ববর্তী অঞ্চল সবুজ ও স্বতন্ত্র থাকলেও মূল শহর একটু ভিন্ন। নওগাঁ শহরের সৌন্দর্য দিনদিন ম্লান হচ্ছে। শহরের যানজট, নদী দূষণ ও পরিবেশ বিপযর্য়, নানা অব্যবস্থাপনা, সংকীর্ণ সড়কে ফুটপাত ইত্যাদি কারণে শহরের সৌন্দর্য পূর্বের তুলনায় অনেকটা কমেছে। সেজন্য শহরের বাসিন্দা এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। নওগাঁ অঞ্চলের মানুষের আঞ্চলিক ভাষা, আচার ব্যবহার ও অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে স্বতন্ত্র ও মাধুর্য্যে ভরপুর। যা পর্যটন শিল্প ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। নওগাঁয় পরিভ্রমণ করলে গ্রামীণ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। যে দিকে তাকানো হয়, শুধু সবুজ মাঠ, পশু-পাখির মিতালি ও নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগে চিত্ত নাড়া দেয়।
শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য চর্চা, শিক্ষা কমিশন পুনর্গঠন, মানসম্মত সিলেবাস এবং রাষ্ট্র্র ও পরিবারের করণীয় ক্ষেত্রে একমাত্র শিক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সরদার ফজলুল করিম কৃত প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ অনুবাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘‘প্লেটোর রাষ্ট্রে শিক্ষা ব্যবস্থা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থা নাগরিকদের স্বাভাবিক জ্ঞান নির্ধারণের উপায় এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে প্রত্যেক নাগরিকদের চরিত্র বিকাশের প্রধান মাধ্যম। তাই পরিকল্পিত এই রাষ্ট্রে শিক্ষার পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্র ব্যতীত অপর কারও এখতিয়ারে ন্যস্ত থাকতে পারে না। প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থা পরিপূর্ণরুপে রাষ্ট্রীয় এবং সামগ্রিক।
এ ক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা (নগরভেদে) স্পার্টার জন্য অভিনব ব্যাপার হলেও এথেন্সের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা অপরিচিত এবং অভিনব ছিল বলে ইতিহাসকারগণ মনে করেন। কারণ এথেন্সে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল ব্যক্তিগত। পরিবারই শিশুদের আদর্শ নিয়ন্ত্রণ করত। এথেন্সের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল—পাঠ এবং লিখন; শরীরচর্চা এবং তৃতীয় পর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা বা সাহিত্যপাঠ। সাহিত্য পাঠ দ্বারা হিসিয়ড হোমার প্রভৃতি প্রখ্যাত কবির কাব্য মুখস্ত করা এবং যন্ত্রসহযোগে গীত গাওয়া বোঝাত। এর মধ্যে সঙ্গীতও তাই অন্তর্ভূক্ত ছিল। এই পর্যায়ের পর অষ্টাদশ বর্ষে শিক্ষার্থীদের দুবৎসরের জন্য সামরিক শিক্ষাও গ্রহণ করতে হতো। প্লেটো তার পরিকল্পনায় এই প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা মোটামুটি গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় করে তাকে সংস্কার করার কথা চিন্তা করেছেন। কবি এবং কাব্যের শোধন এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যাপারে প্লেটোর যে উদ্বেগ এবং আগ্রহ আমাদের কাছে বিস্ময়কর বোধ হয়। তার কারণ এই যে, প্রাচীন গ্রীসে নীতিমালার উৎস হিসাবে কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থের পরিবর্তে প্রখ্যাত কবিদের কাব্য ও বাণীই কাজ করত। ন্যায় অন্যায়ের ব্যাপারে কবিদের বাণীকে বলে উদ্বৃত করা হতো। প্লেটো তার রাষ্ট্রের নীতির প্রয়োজনে কবিদের এই প্রভাবকে এবং ধর্মের পৌরণিক কাহিনী এবং বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব করেন।
সুতরাং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো যায়। প্লেটোকে হুবহু অনুকরণ নয়, বরং বাংলাদেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, অগ্রাধিকারকে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা প্রয়োজন। অন্যদিকে কালরাচাল হেজিমনি বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ রোধ করতে হলে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নীতিমালাগুলো সংশোধন করা দরকার। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, দেশীয় সংস্কৃতি কিংবা মূল্যবোধ শিক্ষা ও সংস্কৃতি নীতিমালায় প্রতিফলন না হওয়ার কারণে অনেক চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ঐচ্ছিক না রেখে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক হুমকি মোকাবেলায় এর জাতীয় কৌশল অবলম্বন করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।
নওগাঁর সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সবার সহযোগিতা ও সদ্দিচ্ছা প্রয়োজন। নওগাঁ জেলার বিদ্যমান কিছু সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নওগাঁর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাথে বাঙালি এবং সমতলের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সংঘর্ষ ও বিরোধ রয়েছে, যা এড়িয়ে চলতে হবে। এক্ষেত্রে আলোচনা ও সম্প্রীতি বজায় রেখে চলা প্রয়োজন। সীমান্তে অনুপ্রবেশ, মাদক ও চোরাচালান ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেজন্য সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমন ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে স্থানীয় জনগণ এবং বিজিবির যৌথ উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা দরকার। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে, বাংলাদেশকে সবুজ, পরিবেশ বান্ধব, টেকসই, সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল, নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে।
লেখক: কবি ও গবেষক।
*মতামত লেখকের নিজস্ব।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন