সাম্প্রতিক
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক নতুন করে তৈরি হবে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মার্কিন ভিসা নিয়ে দুঃসংবাদ, পৌনে ২ লাখ ভিসা বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভয়ে তুরস্ক ছাড়ার সময় বিমান বদলেছিলেন ট্রাম্প একাত্তর টিভির চেয়ারম্যান-সিওওসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে সমন সপ্তাহে একদিন শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি থাকবে জুলাই জাদুঘর গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছে সংসদ সচিবালয়ের চিঠি সৌরভ ও ডোনাকে হত্যার হুমকি, কলকাতা পুলিশের তদন্ত শুরু বাংলাদেশি কৃষককে ধরে নিয়ে গেল বিএসএফ, পাল্টা দুই ভারতীয় কৃষককে আটক গ্রামবাসীর বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেবে সরকার
Skip to content

বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেবে সরকার

ছবি: সংগৃহীত

জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে আরও সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিতে একটি সাধারণ নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তার দাবি, কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে নয়, বরং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী হলে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এ ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি তেল বিক্রি করে। বাংলাদেশেও যাতে সবাই ব্যবসা করতে পারে, সে জন্য একটি সাধারণ নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।

কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগ নাকচ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এটা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। একটি কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য আমরা এটা করছি না। যাতে সবাই ব্যবসা করতে পারে, সেজন্যই একটি নীতি তৈরি করছি।’

মন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। পরে কালোবাজারি ও অনলাইনভিত্তিক জ্বালানি বিক্রির ঘটনাও ঘটে। এ পরিস্থিতির পর বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তার মতে, সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিক বলেও জানান মন্ত্রী। গ্যাসের চাপ কম থাকলে শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎপাদন ও নগদ অর্থপ্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। ‘আমি চাই না, আমাদের জন্য কোনো ব্যবসায়ীর নাম ব্যাংকের লাল খাতায় উঠুক’—বলেন তিনি।

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে দুঃখ প্রকাশ প্রতিমন্ত্রীর

সেমিনারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সংকটে থাকা মানুষের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট হলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও দেশীয় কূপগুলোর উৎপাদন প্রতিবছর প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করে কমছে।

এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, টাকা থাকলেও রাতারাতি এলএনজি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। নতুন একটি এফএসআরইউ কার্যকর করতে ৩০ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগতে পারে। তবে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দুই বছরের কম সময়ে এটি কার্যকর করতে চায়।

তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউ নিয়ে কাজ চলছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য লেনদেন পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং টার্মিনালের জন্য জমিও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এলপিজির বাজারেও হস্তক্ষেপ করবে সরকার

এলপিজির বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এলপিজির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা দাম নির্ধারণ করলেও ভোক্তারা সব সময় নির্ধারিত দামে এলপিজি পান না।

এ কারণে সরকার বাল্ক এলপিজি আমদানি করে বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনবল কাজে লাগিয়ে বাজার স্থিতিশীল করতে চায় বলে জানান তিনি।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘দিন শেষে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতেই হবে।’ অফশোর বিডিং রাউন্ড চালু হয়েছে, যা নভেম্বরে শেষ হবে। একই সঙ্গে অনশোর বিডিং রাউন্ড নিয়েও কাজ চলছে।

‘এফএসআরইউ-এলএনজি আমদানি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়’

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় এফএসআরইউ ও এলএনজি আমদানি প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাধান নয়। জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ডলার সংকটও বড় সমস্যা। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে জ্বালানি সংকট সমাধান কঠিন হবে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে অন্তত ২ হাজার এমএমসিএফডির কাছাকাছি ধরে রাখার পরামর্শ দেন ড. ইজাজ। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানোর কথা বলেন তিনি।

তার হিসাবে, ২০৩০ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৪ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি হতে পারে। এ চাহিদা মেটাতে নতুন এফএসআরইউ প্রয়োজন হবে। তবে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একাধিক উৎস ব্যবহারের পরামর্শ

প্যানেল আলোচনায় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক কোনো একক সমাধান নেই। গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দ্রুত ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে হবে।

বাপেক্স-নির্ভর গ্যাস অনুসন্ধান নীতি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে কাজে লাগাতে হবে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনাময় স্তরগুলো উন্নত প্রযুক্তিতে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ছাতক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে ‘বিপ্লবী পরিবর্তন’ আনতে হবে। এ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ না করা। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেঞ্চমার্ক মূল্য ও বিনিয়োগের শর্ত স্পষ্ট করারও পরামর্শ দেন তিনি।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এফইআরবির চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমান।

এনএনবাংলা/