সাম্প্রতিক
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক নতুন করে তৈরি হবে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মার্কিন ভিসা নিয়ে দুঃসংবাদ, পৌনে ২ লাখ ভিসা বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভয়ে তুরস্ক ছাড়ার সময় বিমান বদলেছিলেন ট্রাম্প একাত্তর টিভির চেয়ারম্যান-সিওওসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে সমন সপ্তাহে একদিন শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি থাকবে জুলাই জাদুঘর গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছে সংসদ সচিবালয়ের চিঠি সৌরভ ও ডোনাকে হত্যার হুমকি, কলকাতা পুলিশের তদন্ত শুরু বাংলাদেশি কৃষককে ধরে নিয়ে গেল বিএসএফ, পাল্টা দুই ভারতীয় কৃষককে আটক গ্রামবাসীর বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেবে সরকার
Skip to content

শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে খেলাধুলার গুরুত্ব

খেলাধুলা শুধু শরীরচর্চা, বিনোদন কিংবা প্রতিযোগিতার মাধ্যম নয়; এটি মানুষের মধ্যে বন্ধন তৈরি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি এবং শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী সামাজিক মাধ্যম। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য ভুলে মানুষকে একই মঞ্চে নিয়ে আসার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে খেলাধুলার। তাই খেলাধুলাকে বলা যায়—মানুষকে একত্রিত করার একটি সর্বজনীন ভাষা।

খেলাধুলা কীভাবে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে?

একটি মাঠে যখন বিভিন্ন মত, পথ ও পরিচয়ের মানুষ একই দলের হয়ে খেলেন, তখন ব্যক্তিগত বিভাজনের চেয়ে দলগত স্বার্থই বড় হয়ে ওঠে। খেলাধুলা মানুষকে শেখায়—প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে হয়, নিয়ম মেনে চলতে হয়, পরাজয় মেনে নিতে হয় এবং বিজয়কে বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়। এই মূল্যবোধগুলোই একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ গঠনের ভিত্তি।

বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় একটি দেশে খেলাধুলার গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, সম্প্রদায় ও শ্রেণি-পেশার মানুষ খেলাধুলার মাধ্যমে একত্রিত হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কিংবা ফুটবল দল যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে, তখন দেশের কোটি কোটি মানুষ নিজেদের বিভেদ ভুলে একই আনন্দ ও আবেগে একত্রিত হয়। একটি জাতীয় দলের সাফল্য তাই শুধু একটি ক্রীড়া সাফল্য নয়; এটি জাতীয় ঐক্য ও সংহতিরও প্রতীক।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার গুরুত্ব

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ শিক্ষার পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, সহনশীলতা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে খেলাধুলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ছোটবেলা থেকেই শিশুরা যদি খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তারা দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শেখে, অন্যের মতামতকে সম্মান করতে শেখে এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও কীভাবে মিলেমিশে থাকা যায়, তা রপ্ত করে। ভবিষ্যতে তারাই সমাজের নেতৃত্ব দেবে। ফলে খেলাধুলার মাঠে অর্জিত মূল্যবোধ একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখতে পারে।

সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় খেলাধুলা

বর্তমান সময়ে তরুণদের একটি অংশ মাদক, অপরাধ, সহিংসতা ও বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের সুস্থ ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে খেলাধুলা হতে পারে অত্যন্ত কার্যকর একটি মাধ্যম।

খেলার মাঠ একজন তরুণকে ব্যস্ত রাখে, শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখে এবং তার মধ্যে লক্ষ্য অর্জনের মানসিকতা তৈরি করে। একই সঙ্গে দলগত খেলায় সে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা পায়। ফলে খেলাধুলা শুধু একজন ভালো খেলোয়াড় তৈরি করে না; একজন ভালো মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।

খেলাধুলা ও রাষ্ট্রের মানুষের সঙ্গে মানুষের সেতুবন্ধন

আমার নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাও আমাকে খেলাধুলার এই শক্তি উপলব্ধি করার সুযোগ দিয়েছে।

চাকরি জীবনে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা তাঁদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ অনেক সময় নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা ও দূরত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। নির্দিষ্ট স্থানে বসে তাঁদের বক্তব্য শোনা—এটাই ছিল বাস্তবতা। কিন্তু খেলাধুলার জগৎ আমাকে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা দিয়েছে।

বিশেষ করে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে ম্যানেজার হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর খুব কাছ থেকে মেডেল, ক্রেস্ট ও প্রাইজমানি উপহার গ্রহণের সুযোগ আমার জীবনের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। চাকরি জীবনে যে ধরনের সরাসরি ও সম্মানজনক মুহূর্ত অর্জন করতে পারিনি, খেলাধুলার মাধ্যমে সেটির একটি অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।

এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে—খেলাধুলা এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা একদিকে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করে, অন্যদিকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সেতুবন্ধন তৈরি করে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছেও পৌঁছানোর একটি ইতিবাচক ও মর্যাদাপূর্ণ পথ তৈরি করতে পারে খেলাধুলা।

এটাই খেলাধুলার বিশেষ শক্তি।

আন্তর্জাতিক শান্তিতেও খেলাধুলার ভূমিকা

খেলাধুলার প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ‘Sports Diplomacy’ বা ক্রীড়া কূটনীতি তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

ভারত-পাকিস্তানের মতো রাজনৈতিকভাবে জটিল সম্পর্কের দুই দেশের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচ বহুবার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও আবেগের একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে। একইভাবে ১৯৭১ সালের ‘Ping-Pong Diplomacy’ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আবার ১৯৯৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপে নেলসন ম্যান্ডেলার ভূমিকা খেলাধুলা কীভাবে সামাজিক বিভাজন দূর করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে, তার একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ।

অর্থাৎ, যেখানে রাজনীতি অনেক সময় মানুষকে বিভক্ত করে, খেলাধুলা সেখানে মানুষকে একই মঞ্চে দাঁড় করাতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও থাকে নিয়ম, সম্মান, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার শিক্ষা।

নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান

আমি মনে করি, খেলাধুলাকে শুধু অবসর কাটানোর মাধ্যম হিসেবে দেখলে চলবে না। খেলাধুলা একটি জীবনচর্চা। নতুন প্রজন্মকে নিয়মিত খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করতে হবে এবং খেলাধুলার মাধ্যমে শৃঙ্খলা, মানবিকতা, সহনশীলতা, নেতৃত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা নিতে হবে।

আজকের তরুণরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তারা যদি খেলাধুলার ইতিবাচক মূল্যবোধ ধারণ করে বেড়ে ওঠে, তাহলে একটি সহনশীল, মানবিক, শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

সবশেষে বলতে চাই—খেলাধুলায় কেউ শুধু জয়ী হয় না, কেউ শুধু পরাজিতও হয় না; খেলাধুলা মানুষকে মানুষ হিসেবে জয় করতে শেখায়। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির যে বন্ধন তৈরি হয়, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

তাই শান্তি ও সম্প্রীতির সমাজ গড়তে খেলাধুলার বিকল্প নেই। খেলাধুলার মাঠ থেকেই আমরা শিখতে পারি—ভিন্নতা থাকলেও একসঙ্গে থাকা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও পরস্পরকে সম্মান করা যায় এবং বিজয়ের চেয়েও বড় হতে পারে মানবিকতা।

খেলাধুলা তাই শুধু খেলা নয়—খেলাধুলা শান্তির ভাষা, সম্প্রীতির সেতু এবং মানুষকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম।

মোঃ আখতারুজ্জামান রেজা তালুকদার রুমি

সাবেক উপপরিচালক, ক্রীড়া পরিদপ্তর

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ঢাকা

এনএনবাংলা/