জুলাই-পরবর্তী সাংস্কৃতিক পরিসর: পরিবর্তনের ইঙ্গিত কোথায়?
কোনো সমাজে বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
কেন থাকে না, কারণ রাষ্ট্র আর সমাজ আলাদা কোনো জগত নয়। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন মানুষের জীবনযাপন, মূল্যবোধ, চিন্তাভাবনা, সামাজিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার ওপর প্রভাব ফেলে। আর এসব পরিবর্তনের স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটে সংস্কৃতিতে। সহজভাবে বললে, রাজনীতি বদলালে মানুষের অভিজ্ঞতা বদলায়, আর মানুষের অভিজ্ঞতা বদলালে সংস্কৃতিও বদলাতে শুরু করে।
কেন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ে?
মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে যায়— বড় রাজনৈতিক আন্দোলন মানুষকে নতুন প্রশ্ন করতে শেখায়। আগে যে বিষয় নিয়ে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ বা অপ্রয়োজনীয় মনে হতো, পরিবর্তনের পর মানুষ সেটি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করতে পারে। সেই নতুন চিন্তা কবিতা, গান, নাটক, চলচ্চিত্র, কার্টুন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষায় প্রকাশ পায়।
নতুন প্রজন্মের ভাষা তৈরি হয়— কোনো বড় আন্দোলনের সময় তরুণরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন স্লোগান, শব্দ, প্রতীক ও প্রকাশভঙ্গি তৈরি করে। এগুলো পরবর্তীতে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, গান, কবিতা, শিল্প ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও ঢুকে পড়ে।
ইতিহাসকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে— রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষ অতীতের ঘটনাগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করে। আগে যাদের ভূমিকা বেশি আলোচিত হয়েছে, তাদের পাশাপাশি নতুন কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অবদান সামনে আসতে পারে। একইভাবে আগে উপেক্ষিত কোনো ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে— দীর্ঘদিন কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী থাকলে রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের পর মানুষ প্রশ্ন করতে পারে: তারা কাদের প্রতিনিধিত্ব করছে? নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর? তাদের সাংস্কৃতিক বয়ান কি সমাজের সব অংশকে ধারণ করছে?
এখান থেকেই নতুন সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব বা নতুন সাংস্কৃতিক উদ্যোগের জন্ম হতে পারে।
শিল্পীরাও সমাজের পরিবর্তন থেকে বিচ্ছিন্ন নন— একজন কবি, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা বা নাট্যকার যে সমাজে বাস করেন, সেই সমাজের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর সৃষ্টিতে কোনো না কোনোভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। কখনো সরাসরি প্রতিবাদ হিসেবে, কখনো প্রতীকীভাবে, আবার কখনো ব্যক্তিগত গল্পের মাধ্যমে।
জনগণের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের ধরনও বদলায়—আগে বড় কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে প্রতিষ্ঠান, হল, সংবাদমাধ্যম ও প্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে তরুণরা নিজেরাই অনুষ্ঠান করতে, শিল্পী জড়ো করতে এবং হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। ফলে সাংস্কৃতিক ক্ষমতার কেন্দ্রও কিছুটা বিকেন্দ্রীভূত হয়।
“কোনো সমাজে বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো বদলে দেয় না; তা মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, ভাষা, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের ওপরও প্রভাব ফেলে। আর মানুষের এই পরিবর্তিত অভিজ্ঞতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলনগুলোর একটি হলো সংস্কৃতি।”
যে কোনো দেশের স্বৈরশাসক কেন কেন বার বারই সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিজেদের দখলে রাখতে চায় ? বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন আলোচিত হয়ে আসছে। কোন ইতিহাস সামনে আসবে, কোন ভাষা গ্রহণযোগ্য হবে, কোন ধরনের শিল্পচর্চা বেশি গুরুত্ব পাবে, এসব বিষয় নিয়ে কেন স্বৈরশাসক মাথা ঘামায় কেন নিজের মতো করে নেয় এই প্রশ্নটা এখন আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
কারণ স্বৈরশাসকের কাছে সংস্কৃতি শুধু গান, কবিতা, নাটক বা সাহিত্য নয়। সংস্কৃতি হলো মানুষের চিন্তা ও স্মৃতি গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তাই যে শাসক দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখতে চান, তিনি শুধু প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করেই সন্তুষ্ট থাকেন না, মানুষের কাছে রাষ্ট্র ও ইতিহাসকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে চান।
এটি বোঝার জন্য কয়েকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের মন জয় করার জন্য— জোর করে মানুষকে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কিন্তু মানুষ যদি শাসকের তৈরি গল্প, প্রতীক ও ইতিহাসকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে, তাহলে ক্ষমতা অনেক বেশি স্থায়ী হয়।
এ কারণেই কর্তৃত্ববাদী সরকার সাধারণত এমন সাংস্কৃতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে শাসককে দেশ, জাতীয় পরিচয় বা কোনো ঐতিহাসিক অর্জনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করা হয়।
ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা— ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা নয়, বর্তমানের রাজনৈতিক বৈধতারও উৎস।
কে স্বাধীনতার নায়ক?
কার অবদান কতটা?
কোন আন্দোলনকে গণআন্দোলন বলা হবে?
কোন ঘটনাকে রাষ্ট্রের গৌরব হিসেবে তুলে ধরা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর যদি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক পরিসর নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে শাসক তার নিজের রাজনৈতিক বৈধতার একটি গল্প তৈরি করতে পারে।
তাই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু বর্তমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, ইতিহাসের বয়ান পুনরুদ্ধারের লড়াইও হতে পারে।
কোন কণ্ঠস্বর ‘গ্রহণযোগ্য’, তা নির্ধারণ করা— সংস্কৃতির ওপর প্রভাব বিস্তারের আরেকটি পথ হলো ঠিক করে দেওয়া, কে কথা বলবেন এবং কীভাবে কথা বলবেন।
কোন শিল্পী রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পাবেন, কোন সাহিত্যিক বেশি প্রচার পাবেন, কোন গান সরকারি অনুষ্ঠানে বাজবে, কোন নাটক মঞ্চায়নের সুযোগ পাবে, কোন বক্তব্যকে ‘প্রগতিশীল’ আর কোনটিকে ‘বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, এসব সিদ্ধান্ত সাংস্কৃতিক পরিসরকে প্রভাবিত করতে পারে।
ফলে সরাসরি সেন্সরশিপ না থাকলেও পৃষ্ঠপোষকতা ও বঞ্চনার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হতে পারে।
বিকল্প পরিচয়কে দুর্বল করা— স্বৈরশাসন সাধারণত একটি নির্দিষ্ট জাতীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।
কারণ মানুষের যদি নিজস্ব বহুস্তরীয় পরিচয়, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শক্তিশালী বোধ থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের তৈরি একক রাজনৈতিক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া কঠিন হয়।
তাই লোকসংস্কৃতি, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্য, তরুণদের নতুন সাংস্কৃতিক ভাষা, এমনকি ভিন্ন রাজনৈতিক ইতিহাসও কখনো কখনো ক্ষমতার জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
সংস্কৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রভাবিত করে—
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একটি সরকার পাঁচ বছর বা দশ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে। কিন্তু স্কুলের বই, গান, কবিতা, চলচ্চিত্র, নাটক, স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক প্রতীকের মাধ্যমে যে বয়ান তৈরি হয়, তার প্রভাব কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত থাকতে পারে।
অর্থাৎ রাজনীতি বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, আর সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে স্বৈরশাসকের কাছে সংস্কৃতি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
স্বৈরশাসক কেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নিজের প্রভাবের মধ্যে রাখতে চান, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সংস্কৃতিকে শুধু গান, কবিতা, নাটক বা সাহিত্য হিসেবে দেখলে চলবে না। সংস্কৃতি মানুষের চিন্তা, স্মৃতি, মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয় নির্মাণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই রাষ্ট্রক্ষমতা যখন কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে, তখন সাংস্কৃতিক পরিসরও তার নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।
একজন স্বৈরশাসক জানেন, কেবল পুলিশ, প্রশাসন কিংবা আইন দিয়ে মানুষের আনুগত্য দীর্ঘস্থায়ী করা যায় না। মানুষের মনে নিজের শাসনের একটি গ্রহণযোগ্য গল্প তৈরি করতে হয়। সেই গল্পে শাসককে কখনো জাতীয় ইতিহাসের অপরিহার্য চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, কখনো রাষ্ট্র ও শাসককে একাকার করে দেখানো হয়। আর এই বয়ান প্রতিষ্ঠায় সংস্কৃতি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার।
তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কোন গান বাজবে’ বা ‘কোন নাটক মঞ্চস্থ হবে’ তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোন ইতিহাস বলা হবে, কার অবদান স্মরণ করা হবে, কার অবদান আড়াল থাকবে, কোন ভাষাকে গ্রহণযোগ্য বলা হবে এবং কোন কণ্ঠস্বরকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলা হবে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি আলোচিত। এখানে প্রশ্ন ওঠে, আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব কি সমাজের সব শ্রেণি, অঞ্চল ও প্রজন্মের অভিজ্ঞতাকে সমানভাবে ধারণ করছে? নাকি কোনো নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বলয় দীর্ঘদিন ধরে ‘গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতি’র সংজ্ঞা নির্ধারণে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেছে?
এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। সংস্কৃতির ওপর রাষ্ট্রের প্রভাব আর রাষ্ট্রের সরাসরি সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। রাষ্ট্র শিল্প-সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেই পারে। কিন্তু যখন পৃষ্ঠপোষকতা রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হয়ে দাঁড়ায় এবং ভিন্নমত সাংস্কৃতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়ে, তখন সেটি আর স্বাভাবিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকে না; সেটি সাংস্কৃতিক ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিণত হয়।
এই কারণেই স্বৈরশাসনের পতনের পর শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার করলেই যথেষ্ট নয়। সাংস্কৃতিক পরিসরকেও আরও উন্মুক্ত করতে হয়। সেখানে কোনো একক মতাদর্শ, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী যেন সংস্কৃতির একমাত্র অভিভাবক হয়ে উঠতে না পারে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি হলো বহুত্ববাদ। গ্রাম ও শহর, সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু, পুরোনো ও নতুন প্রজন্ম, প্রতিষ্ঠিত শিল্পী ও নতুন শিল্পী, লোকসংস্কৃতি ও আধুনিক শিল্পচর্চা—সবকিছুর জন্য জায়গা থাকতে হবে।
কারণ একটি জাতির সংস্কৃতি তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন সেটি কোনো শাসকের সংস্কৃতি নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সংস্কৃতি নয়, বরং মানুষের সংস্কৃতি হয়ে ওঠে।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জও এখানেই। শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, সংস্কৃতির মালিকানার ধারণাটিও বদলাতে হবে। সংস্কৃতির মালিক রাষ্ট্র নয়; কোনো রাজনৈতিক দলও নয়। সংস্কৃতির প্রকৃত মালিক জনগণ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে কি নতুন কোনো রূপান্তর শুরু হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। এ দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগ্রামে সাংস্কৃতিক কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করেছে এবং জাতীয় পরিচয় নির্মাণে অবদান রেখেছে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ে যে সাংস্কৃতিক ভাষা ও কাঠামো সমাজে প্রভাবশালী ছিল, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেটি সবসময় একইভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। কারণ সমাজের অভিজ্ঞতা বদলায়, মানুষের প্রত্যাশা বদলায়, প্রকাশের মাধ্যম বদলায়।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে তরুণদের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তরুণরা নিজেদের উদ্যোগে স্মরণ অনুষ্ঠান, কনসার্ট, কবিতা পাঠ, চিত্রকর্ম, আলোচনা এবং নানা সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব উদ্যোগের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এগুলোর বিকেন্দ্রীভূত চরিত্র। কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তরুণরা সংগঠিত হয়েছে এবং নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
এটি একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ অতীতে সাংস্কৃতিক উদ্যোগের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্তমানে প্রযুক্তি সাধারণ মানুষকে নিজের গল্প বলার, নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনকে শুধু পুরোনো বনাম নতুনের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে বাস্তবতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। একটি দেশের সংস্কৃতি এগিয়ে যায় ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তনের সমন্বয়ে। অতীতের অভিজ্ঞতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নতুন প্রজন্মের নতুন ভাবনা ও নতুন প্রকাশভঙ্গিও অপরিহার্য।
বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হলো সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব। কোন মানুষের গল্প বলা হবে, কোন ইতিহাস গুরুত্ব পাবে, কোন ভাষা বা অভিব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হবে, এসব প্রশ্ন সব সমাজেই আলোচিত হয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এসব বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক। বরং মতের বৈচিত্র্য ও মুক্ত আলোচনা সাংস্কৃতিক বিকাশের অন্যতম শর্ত।
সংস্কৃতি কখনো কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি হতে পারে না। একটি দেশের সংস্কৃতি তৈরি হয় তার মানুষের জীবন থেকে। গ্রামের লোকগান, শহরের নাগরিক অভিজ্ঞতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, তরুণদের স্বপ্ন, শিল্পীর কল্পনা এবং সমাজের নানা স্তরের মানুষের গল্প একসঙ্গে মিলেই জাতীয় সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি করে।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে তরুণদের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। তারা নিজেদের ভাষায়, নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রকাশ তৈরি করছে। এই পরিবর্তনকে বোঝা এবং তার সঙ্গে সংলাপ তৈরি করা প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিবাদ ও আবেগের পাশাপাশি সৃজনশীলতা, সহনশীলতা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান বজায় রাখা জরুরি। কারণ সংস্কৃতি শুধু ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিও।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কীভাবে এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করি তার ওপর। যদি পুরোনো অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রজন্মের শক্তির মধ্যে একটি গঠনমূলক সংলাপ তৈরি হয়, তবে দেশের সাংস্কৃতিক পরিসর আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সংস্কৃতি সবসময় মানুষের মধ্য থেকেই নতুন শক্তি খুঁজে নেয়। কোনো নির্দিষ্ট সময়ের প্রভাবশালী ধারা চিরস্থায়ী নয়। নতুন বাস্তবতা নতুন প্রশ্ন তৈরি করে, নতুন কণ্ঠ তৈরি করে এবং নতুন সাংস্কৃতিক ভাষার জন্ম দেয়।
এই পরিবর্তনকে সংকীর্ণ বিরোধ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিকাশের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা প্রয়োজন। যেখানে ঐতিহ্য থাকবে, কিন্তু নতুন চিন্তার পথও খোলা থাকবে; যেখানে অতীতকে সম্মান করা হবে, কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও স্বাগত জানানো হবে।
লেখক: নিউইয়র্ক প্রবাসী কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।
