সাম্প্রতিক
Skip to content

চাষের মাছে কাদা-কাদা গন্ধ হয় কেন, কী করলে গন্ধ থাকবে না?

ছবি: বিবিসি নিউজ বাংলা-এর সৌজন্যে

‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও জাতিসত্তার সঙ্গে মাছের সম্পর্ক বহু পুরোনো। তাই বাঙালির পাতে নানা রেসিপিতে মাছ থাকেই। গত কয়েক দশকে দেশের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে মাছ চাষের পরিসরও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে মাছের উৎপাদন ও রপ্তানি।

তবে বাজার থেকে তাজা দেখে মাছ কেনার পরও রান্নার সময় অনেকেই এক ধরনের কাদা-কাদা বা স্যাঁতসেঁতে গন্ধের অভিযোগ করেন। মাছ ধুয়ে-কেটে লেবু, লবণ, হলুদ, আদা-রসুন দিয়েও অনেক সময় সেই গন্ধ পুরোপুরি দূর করা যায় না।

অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। গত কয়েক দশকে মাছ চাষেও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান আড়াই শতাংশের বেশি। কিন্তু ভোক্তার প্লেটে পৌঁছানোর পর মাছের স্বাদ ও তৃপ্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

গন্ধের কারণ কী?

বাংলাদেশে চাষ করা বিভিন্ন মাছের গন্ধের কারণ এবং তা দূর করার উপায় নিয়ে গবেষণা করছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের মতে, দুটি জৈব যৌগ মাছের শরীরে চর্বি ও চামড়ার নিচের লাল মাংসে জমা হয়ে এ ধরনের গন্ধ তৈরি করে। ফলে মাছ বারবার ধুলে কিংবা রান্না করলেও গন্ধ পুরোপুরি দূর হয় না।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক এ গন্ধের জন্য কয়েক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থেকে নিঃসৃত উপাদানকে দায়ী করেছেন।

তিনি বলেন, বদ্ধ পানি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় একজিনো ব্যাকটেরিয়া, মিকজো ব্যাকটেরিয়া ও সায়ানো ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। এসব ব্যাকটেরিয়া থেকে জিওসমিন (Geosmin) এবং ২-মিথাইলআইসোবোর্নিওল (2-Methylisoborneol) নামের দুটি জৈব যৌগ নিঃসৃত হয়।

মূলত মাছ চাষের ক্ষেত্রে পুকুরে মাছের ঘনত্ব, খাবারের পরিমাণ এবং পানি পরিবর্তনসহ বেশ কিছু নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অনেক চাষি এসব নিয়ম যথাযথভাবে মানছেন না বলে মনে করেন অধ্যাপক হক।

তার মতে, মাছের শরীরে যেখানে চর্বি থাকে এবং দেহের ওপরের চামড়ার নিচে থাকা রেড মাসেলে এসব যৌগ জমে গন্ধ তৈরি হয়।

যেভাবে বাড়ে গন্ধ তৈরির ব্যাকটেরিয়া

গবেষকরা বলছেন, গন্ধ তৈরির জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পুকুরে অতিরিক্ত খাবার দেওয়া, পুকুরের আকারের তুলনায় বেশি মাছ রাখা এবং দীর্ঘদিন পানি পরিবর্তন না করা।

অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য পুকুর রয়েছে। অনেক জায়গায় পানি বের করে পুরোনো পানি পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও অনেক জায়গায় তা সম্ভব হয় না। আবার খরচের কারণেও অনেকে পানি পরিবর্তন করেন না।

ফলে বছরের পর বছর পুকুরের তলায় কাদা ও বর্জ্য জমতে থাকে। একসময় সেখানে গড়ে ওঠে যেন ‘গন্ধের কারখানা’। এ কারণেই বহমান নদীর মাছে সাধারণত এ ধরনের কাদা-কাদা গন্ধ থাকে না।

অতিরিক্ত খাবারও এ সমস্যার অন্যতম কারণ। অনেক মৎস্য চাষি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার দিয়ে থাকেন। মাছ সব খাবার গ্রহণ করতে না পারায় বাকি খাবার পুকুরের তলায় পড়ে পচে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় মাছের মলমূত্র। এসব পচনশীল জৈব পদার্থই গন্ধ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার আদর্শ খাদ্য।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, মাছকে দেওয়া সব খাবার মাছ পুরোপুরি গ্রহণ করে না। অতিরিক্ত খাবার পানিতেই পচে যায়। মূলত মাটি ও পানির গুণাগুণের ওপর মাছের স্বাদ ও গন্ধ নির্ভর করে।

শুধু গন্ধ নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও আছে কি?

চাষের মাছের গন্ধের পাশাপাশি তা খাওয়ার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

২০২৩ সালে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক নাটোরের একটি বাণিজ্যিক খামারের রুই, মৃগেল, সিলভার কার্পসহ কয়েক প্রজাতির মাছ নিয়ে পরীক্ষা করেন। ওই গবেষণায় মৃগেল মাছে ক্রোমিয়ামের মাত্রা নিরাপদ সীমার প্রায় চার গুণ বেশি পাওয়া যায়।

ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, খাবারে ০.১৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্রোমিয়াম সহনীয়। এর বেশি হলে তা কিডনি ও যকৃতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

গবেষকদের মতে, নিয়মিত পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার না করলে সেখানে ধীরে ধীরে ভারী ধাতু ও আবর্জনা জমতে পারে। তাই অন্তত তিন বছর পরপর পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার করা উচিত।

মৎস্যবিজ্ঞানী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহফুজুল হক এ পরিস্থিতিকে ‘অ্যাকুয়াকালচার ভায়োলেন্স’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, মাছ চাষের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়াগুলো ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না, মাঠপর্যায়ে তা পর্যবেক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বেশি লাভের আশায় অনেক মৎস্য চাষি স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল মানছেন না।

তবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত কাঁচা বা আধা-সিদ্ধ মাছ খাওয়া হয় না। ভালোভাবে রান্না করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমে। তবে মাছ খাওয়ার সময় যে তৃপ্তি, অতিরিক্ত গন্ধের কারণে তা অনেকাংশেই কমে যায়।

গন্ধ দূর করতে নতুন পদ্ধতি ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার’

চাষের মাছের গন্ধ দূর করতে মৎস্য বিজ্ঞানীরা এখন ‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম’ নামে একটি নতুন পদ্ধতির কথা বলছেন।

এ পদ্ধতিতে পানিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ক্লোরেলার মতো মাইক্রোঅ্যালগি ব্যবহার করে অ্যামোনিয়া ও বিষাক্ত গ্যাস কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত সার ও নিম্নমানের ফিডের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

‘বটম ক্লিন অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেমে’ প্রচলিত পুকুরের পরিবর্তে পৃথক পানির ট্যাংকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্জ্য অপসারণ, পানি শোধন ও পুনঃব্যবহার এবং ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্পের প্রধান গবেষক মো. মনিরুজ্জামান জানান, এ পদ্ধতিতে মাছের মল, না খাওয়া খাবার কিংবা পচা জৈব পদার্থ পানির স্রোতে গড়িয়ে মাঝের পাইপ দিয়ে বের হয়ে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়া তৈরির সুযোগ থাকে না।

এ ছাড়া এয়ার ব্লোয়ারের মাধ্যমে ট্যাংকে সবসময় অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। এতে মাছ চাপমুক্ত থাকে এবং দ্রুত বেড়ে ওঠে।

ইতোমধ্যে এ পদ্ধতিতে টেংরা, গুলশা, পাবদা ও শিং মাছ চাষ করে সফলতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন মো. মনিরুজ্জামান।

তার দাবি, এ পদ্ধতিতে ওষুধ ব্যবহার ছাড়াই দ্রুত মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি মাছের গন্ধ, স্বাদ ও মান ভালো রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে খরচ কম এবং পরিচালন পদ্ধতিও তুলনামূলক সহজ।

তিনি বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মাছের স্টকিং ডেনসিটি বা মজুদের ঘনত্ব অপ্টিমাইজ করা। শিং মাছের ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ১৩০ কেজি পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া গেছে। ক্যাটফিশের স্বাভাবিক কালচার সময় সাত মাস হলেও এ পদ্ধতিতে কোনো ধরনের ওষুধ ব্যবহার না করে ১২০ দিনেই হারভেস্ট করা সম্ভব হয়েছে।

মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এ পদ্ধতিতে মাছের মধ্যে কোনো গন্ধ থাকে না, কাদার গন্ধও থাকে না এবং মাছের রংও ভালো থাকে। অল্প জায়গায় অধিক মাছ উৎপাদন করা যায়।

গবেষকরা মনে করছেন, এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরেও ঘরোয়া পর্যায়ে মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ ঢাকা বা অন্যান্য শহরে বাসার ছাদ কিংবা শেডের ভেতর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গন্ধহীন মাছ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে।

খুব দ্রুত মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ের মৎস্য চাষি ও উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন প্রকল্পের প্রধান গবেষক।

জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও)-এর ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাছসহ জলজ প্রাণী উৎপাদন বা চাষে বিশ্বে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

(প্রতিবেদনটি বিবিসি নিউজ বাংলা থেকে নেওয়া)

এনএনবাংলা/