সাম্প্রতিক
জাফর ইকবাল-মাকসুদ কামালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মানবতাবিরোধী অপরাধ: ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ দুই বছরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ১২ শতাংশের বেশি, বাড়ছে উদ্বেগ ইমরান খানের বোন আলীমা খানকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার ১৯ দিনে দেশে এলো ২৩ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা ও রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি চালিত রিকশা: প্রয়োজন পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সরকারি নথিতে গুদামে লাখ লাখ টন, তবুও কৃষক পাচ্ছে না সার কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন, ছড়িয়ে পড়ছে পাশের বগিতেও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা
Skip to content

যাত্রী নেই, প্রতিদিন ৫০-৬০ হাজার টাকা লোকসান: সংকটে বিআরটিসির ‘পিংক বাস’

স্বল্প ট্রিপ, সীমিত রুট ও প্রচারের ঘাটতিতে যাত্রী পাচ্ছে না পিংক বাস। ছবি: শামীম আহমেদ

নারীদের জন্য নিরাপদ ও পৃথক গণপরিবহন নিশ্চিত করতে চালু করা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ‘পিংক বাস’ সেবা প্রত্যাশিত যাত্রী পাচ্ছে না। ঢাকার ১০টি রুটে চলাচল করলেও যাত্রী সংকটে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান গুনছে বিআরটিসি। ২৭ ও ৩০ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, দুই দিনে ১৪টি বাস ৩০টি ট্রিপ পরিচালনা করে লোকসান করেছে ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা।

গত ১৮ আগস্ট নারী চালক ও নারী সহকারী দিয়ে এই বিশেষ বাসসেবা চালু করা হয়। শুরুতে বাস ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলা হলেও চালুর এক মাসের বেশি সময় পরও যাত্রীসংখ্যা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

৭৫ আসনের বাসে সর্বোচ্চ ১৫ যাত্রী

গত রোববার বিকালে কমলাপুর ডিপো থেকে মিরপুর-১২-এর উদ্দেশে ছেড়ে যায় নারীদের জন্য নির্ধারিত একটি পিংক বাস। ৭৫ আসনের বাসটি মতিঝিল, পল্টন, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, আসাদগেট ও কল্যাণপুর হয়ে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে মিরপুর-১২ পৌঁছায়। পুরো যাত্রাপথে বাসটিতে সর্বোচ্চ যাত্রী ছিলেন মাত্র ১৫ জন।

বিআরটিসির ১০টি রুটেই প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটির হিসাবে, প্রতিটি বাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে।

দিনে মাত্র দুই ট্রিপ, ভোগান্তিতে যাত্রীরা

যাত্রীদের অভিযোগ, পিংক বাসের বড় সমস্যা সীমিত সময়সূচি। প্রতিদিন একটি বাসে মাত্র দুটি ট্রিপ—সকালে একটি এবং বিকেলে একটি—চালানো হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বাস মিস করলে পরবর্তী ট্রিপের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে অনেক নারী বাধ্য হয়ে সাধারণ বাস, রিকশা কিংবা অন্য পরিবহন ব্যবহার করেন।

আসাদগেট থেকে কারওয়ানবাজারে নিয়মিত যাতায়াতকারী তানিয়া আক্তার জানান, যানজটের কারণে মিরপুর থেকে আসা পিংক বাস অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে আসাদগেটে পৌঁছায় না। কখনো ২০ মিনিট পর্যন্ত দেরি হয়।

তার মতে, বাসের অবস্থান জানার জন্য অ্যাপভিত্তিক লাইভ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হলে যাত্রীদের অপেক্ষার ভোগান্তি কমতে পারে।

রুট ও ট্রিপ বাড়ানোর দাবি

যাত্রীদের মতে, সীমিত রুট, কম ট্রিপ এবং অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সূচি পিংক বাসের যাত্রী সংকটের অন্যতম কারণ। আবার অনেক নারী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাতায়াত করেন। ফলে শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত বাস সব সময় তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামান্না প্রতিদিন ফার্মগেট থেকে কল্যাণপুরে যাতায়াত করেন। তবে আগে ওই রুটে পিংক বাস চলাচলের বিষয়টি তিনি জানতেন না।

অনেক নারী যাত্রী ডাবল ডেকার বাসের পরিবর্তে মিনিবাস চালু এবং আরও বেশি রুটে সেবা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানো হলে একটি বাস মিস করলেও পরবর্তী বাসে ওঠার সুযোগ থাকবে। এতে এই সেবার প্রতি নারীদের আগ্রহও বাড়তে পারে।

পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন পরিবহন বিশেষজ্ঞের

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান মনে করেন, যথেষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই নারীদের জন্য নতুন করে এই বাসসেবা চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অতীতে নারীদের জন্য চালু করা বাসসেবাগুলো কেন ব্যর্থ হয়ে বন্ধ হয়েছিল, তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সেবা চালুর আগে মাঠপর্যায়ে গবেষণা ও সমীক্ষা করা উচিত ছিল।

নারীদের জন্য বিআরটিসির চতুর্থ উদ্যোগ

ঢাকায় নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালুর ক্ষেত্রে বিআরটিসির বর্তমান উদ্যোগটি চতুর্থ প্রচেষ্টা।

১৯৯৮ সালে প্রথমবার নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবা চালু করে বিআরটিসি। ২০০১ সালে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সেবাটি সম্প্রসারণ করা হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৯ সালে আবার সেবাটি চালু করা হয়। তবে আর্থিক লোকসানের কারণে ২০১৫ সালে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর ২০১৮ সালে বিআরটিসি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান র‌্যাংগস যৌথভাবে ‘দোলনচাঁপা’ নামে নারীদের জন্য আরেকটি বাসসেবা চালু করে। সেটিও ২০২২ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

১৮ আগস্ট নারী চালক ও নারী সহকারী দিয়ে বিশেষ বাসসেবা ‘পিংক বাস’ চালু করা হয়। ফাইল ছবি: শামীম আহমেদ

ঢাকার ১০ রুটে চলছে পিংক বাস

বর্তমানে ঢাকার ১০টি রুটে পিংক বাস চলাচল করছে। রুটগুলো হলো—নতুন বাজার (কোকাকোলা)-মতিঝিল, তালতলা-মতিঝিল, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-জিপিও, মিরপুর-১০-মতিঝিল, মিরপুর-মতিঝিল, মিরপুর-১২-মতিঝিল, নারায়ণগঞ্জ-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল, আবদুল্লাহপুর-মতিঝিল এবং বিমানবন্দর-গাজীপুর।

ঢাকার বাইরে বগুড়ায় শেরপুর-মাটিডালি ও বনানী-মোকামতলা—এই দুটি রুটে এবং চট্টগ্রামে কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটেও নারীদের জন্য এই বাসসেবা চালু রয়েছে।

দুই দিনে আয় ২৭ হাজার, ব্যয় প্রায় দেড় লাখ টাকা

বিআরটিসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, পিংক বাস পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।

২৭ ও ৩০ আগস্ট ১০টি ডিপোর ১৪টি পিংক বাস মোট ৩০টি ট্রিপ পরিচালনা করে। ওই দুই দিনে ১ হাজার ৭৯২টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয় ২৭ হাজার ৪২ টাকা। বিপরীতে জ্বালানি, টোল, বেতনসহ পরিচালন ব্যয় ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে দুই দিনে মোট লোকসান হয় ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা। প্রতিদিন গড়ে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬১ হাজার টাকা।

যাত্রী বাড়লেও আয় বাড়ছে সামান্য

সাম্প্রতিক সময়ে পিংক বাসে যাত্রী সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। ১৯ আগস্ট ১২টি বাসে যাত্রী ছিল ৬৬৯ জন। ১৬ সেপ্টেম্বর ১৩টি বাসে যাত্রী বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৫ জনে।

তবে যাত্রী বাড়লেও আয় খুব বেশি বাড়েনি। ১৯ আগস্ট আয় হয়েছিল ১০ হাজার ৭৫ টাকা। ওই দিন প্রতি যাত্রীর বিপরীতে গড় আয় ছিল ১৫ টাকা এবং প্রতি বাসে আয় ছিল ৮৩৯ টাকা।

১৬ সেপ্টেম্বর আয় বেড়ে হয় ১৪ হাজার ৯১৪ টাকা। সেদিন প্রতি যাত্রীর বিপরীতে গড় আয় ছিল ১৪ টাকা ৪০ পয়সা এবং প্রতি বাসে গড় আয় ছিল ১ হাজার ১৪৭ টাকা।

নারীদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহনের লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া পিংক বাসে যাত্রী সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও সীমিত রুট, কম ট্রিপ, সময়সূচি, প্রচারের ঘাটতি ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে সেবাটি এখনো কাঙ্ক্ষিত যাত্রী ও আয় নিশ্চিত করতে পারেনি।

এনএনবাংলা/