সাম্প্রতিক
জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবি নুরের, বললেন ‘সুযোগ দিলে ভয়ংকর বিপর্যয়’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের বিজ্ঞপ্তি দিয়েও প্রত্যাহার ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের ডিম–মুরগির-সবজির দাম বাড়তি, বাজারে হাঁসফাঁস ক্রেতার ‘হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হচ্ছে ঢাকা, কী উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার ‘ক্রেজি পিল’ ইয়াবায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, বাড়ছে আসক্তির ঝুঁকি রাষ্ট্রপতির শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নিলেন নতুন চার মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী রাজধানীর সড়কে এআই ক্যামেরার ‘অদৃশ্য চোখ’, কোন অপরাধে কত জরিমানা হোটেল রুম নোংরা ও জরিমানার অভিযোগ, জেমসের দাবি—‘এটা কোনো বিষয়ই না’ আর্জেন্টিনার পারেদেস ১০ ম্যাচ নিষিদ্ধ, আরও যারা শাস্তি পেলেন
Skip to content

বাংলা কিউআর: ডিজিটাল বাংলাদেশের নতুন পেমেন্ট বিপ্লব

বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ই-কমার্স, অনলাইন বিল পরিশোধ এবং সরকারি ডিজিটাল সেবার বিস্তারের ফলে অর্থনৈতিক লেনদেনের ধরনও বদলে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে এখন যে প্রযুক্তিটি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা হলো QR-ভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর’ উদ্যোগ সেই পরিবর্তনকে একটি জাতীয়, আন্তঃপরিচালনযোগ্য এবং অপেক্ষাকৃত সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

বাংলা কিউআরকে কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না। এটি বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসার আনুষ্ঠানিকীকরণ, নগদনির্ভরতা হ্রাস, লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ ডিজিটাল অর্থনীতির অবকাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে একই সঙ্গে এর সফলতা নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর আস্থা, প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যয় কাঠামো এবং দেশের ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর সক্ষমতার ওপর।

বাংলা কিউআর কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলা কিউআর-এর মূল ধারণা হলো—একজন ব্যবসায়ীর জন্য একটি অভিন্ন QR কোড থাকবে এবং গ্রাহক নিজের ব্যাংক অ্যাপ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) বা অনুমোদিত পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহার করে সেই কোড স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। ফলে একই ব্যবসায়ীর সামনে বিভিন্ন ব্যাংক বা MFS-এর জন্য একাধিক QR কোড প্রদর্শনের প্রয়োজন কমে যাবে।

এই আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা বা interoperability-ই বাংলা কিউআর-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কোনো গ্রাহক কোন ব্যাংকের হিসাব ব্যবহার করছেন বা কোন MFS প্ল্যাটফর্মে অর্থ রাখছেন—তা যেন মার্চেন্টের পেমেন্ট গ্রহণের সক্ষমতার বাধা না হয়, সেটিই এর মৌলিক উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের Payment Systems Report 2025-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলা কিউআর প্রায় ৯.৬৩ লাখ মার্চেন্টের কাছে পৌঁছেছে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে ৪৬টি ব্যাংক, ৭টি MFS প্রদানকারী এবং ৪টি Payment Service Provider যুক্ত হয়েছে।

২০২৫ সালে বাংলা কিউআর-এর মাধ্যমে ২,৭০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে এবং লেনদেনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৬ লাখ। একই সময়ে বাংলাদেশে সামগ্রিক পেমেন্ট সিস্টেমে লেনদেনের সংখ্যা ১৯ শতাংশ বেড়ে ১০৮ কোটিতে পৌঁছেছে।

এই পরিসংখ্যান বাংলা কিউআর-এর সম্ভাবনা বোঝায়, তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও প্রকাশ করে: মার্চেন্টের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও মোট ডিজিটাল পেমেন্টের তুলনায় বাংলা কিউআর-এর ব্যবহার এখনো সীমিত। অর্থাৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রথম ধাপটি সম্পন্ন হচ্ছে; এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো সক্রিয় ব্যবহার বৃদ্ধি।

প্রথম সাফল্য: একটি জাতীয় পেমেন্ট মানদণ্ডের দিকে অগ্রযাত্রা

বাংলা কিউআর-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ। এতদিন বিভিন্ন ব্যাংক, MFS ও পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী নিজেদের পৃথক পেমেন্ট ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। এতে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হলেও ব্যবহারকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে জটিলতা বেড়েছে।

একজন ছোট ব্যবসায়ীকে একাধিক QR কোড রাখতে হয়েছে। একজন গ্রাহককে অনেক সময় নির্দিষ্ট অ্যাপ বা নির্দিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। বাংলা কিউআর এই সমস্যাকে ‘এক মার্চেন্ট, এক QR’ ধারণার মাধ্যমে কমানোর চেষ্টা করছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর-এর জন্য instant settlement চালুর অনুমোদন দিয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অর্থ দ্রুত নিষ্পত্তি হলে তাদের দৈনন্দিন তারল্য ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। একটি ক্ষুদ্র দোকানদার যদি প্রতিদিনের বিক্রয়ের অর্থ দ্রুত তার ব্যাংক বা ডিজিটাল ওয়ালেটে পান, তাহলে তিনি সরবরাহকারীকে অর্থ পরিশোধ, পুনরায় পণ্য ক্রয় এবং ব্যবসার কার্যকর মূলধন ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবেন।

বাংলা কিউআর এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি

বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাব, MFS হিসাব এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিস্তার আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু হিসাব থাকা এবং সেই হিসাব সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। প্রকৃত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি তখনই নিশ্চিত হয়, যখন মানুষ সঞ্চয়, অর্থপ্রদান, ঋণ, বীমা এবং অন্যান্য আর্থিক সেবা নিয়মিত ব্যবহার করতে পারে।

বাংলা কিউআর এই ব্যবধান কমাতে পারে। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য ব্যাংক কার্ডের POS মেশিন স্থাপন অনেক সময় ব্যয়বহুল বা জটিল হতে পারে। কিন্তু QR কোডের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম অবকাঠামো নির্ভর।

এটি বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসা এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস তৈরি হলে ভবিষ্যতে বিকল্প তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ মূল্যায়ন করা সম্ভব হতে পারে। একজন ব্যবসায়ীর নিয়মিত ডিজিটাল বিক্রয়, নগদ প্রবাহ এবং পেমেন্ট ইতিহাস তার ব্যবসায়িক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।

তবে এখানে সতর্কতা প্রয়োজন। ডিজিটাল লেনদেনের তথ্যকে ঋণ মূল্যায়নে ব্যবহার করা হলে ডেটা গোপনীয়তা, গ্রাহকের সম্মতি এবং তথ্য ব্যবহারের স্বচ্ছ নীতি নিশ্চিত করতে হবে।

নগদ অর্থের বিকল্প—কিন্তু নগদ বিলোপ নয়

ডিজিটাল পেমেন্টের আলোচনায় ‘cashless economy’ শব্দটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে কোনো দেশ দ্রুত সম্পূর্ণ নগদবিহীন হয়ে যায় না। উন্নত দেশগুলোতেও নগদ অর্থের ব্যবহার পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে নগদ অর্থের ভূমিকা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সুতরাং বাংলাদেশের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘cashless’ নয়, বরং ‘less-cash economy’—অর্থাৎ যেখানে নগদ অর্থের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমবে এবং ডিজিটাল পেমেন্ট অধিকাংশ দৈনন্দিন লেনদেনের সহজ বিকল্প হয়ে উঠবে।

বাংলা কিউআর এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গ্রাহককে জোর করে ডিজিটাল পেমেন্টে নিয়ে আসার পরিবর্তে নিরাপদ, সহজ ও সাশ্রয়ী বিকল্প প্রদানই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা: বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে?

বাংলাদেশের বাংলা কিউআর উদ্যোগকে ভারত, কেনিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করলে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

  • ভারতের UPI: অবকাঠামো থেকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ
  • ভারতের Unified Payments Interface বা UPI বিশ্বের অন্যতম সফল interoperable payment infrastructure হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • ভারতের NPCI-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে UPI-তে ৭২০টি ব্যাংক যুক্ত ছিল এবং মাসে ২৩,২০১.৯৩ মিলিয়ন বা প্রায় ২৩.২ বিলিয়ন লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে; লেনদেনের মোট মূল্য ছিল ২৯,৯০,৪২৪.২১ কোটি ভারতীয় রুপি।

এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সফল ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা শুধু QR কোডের ওপর নির্ভর করে না। এর পেছনে প্রয়োজন: শক্তিশালী কেন্দ্রীয় পেমেন্ট অবকাঠামো; আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা; কম লেনদেন ব্যয়; দ্রুত নিষ্পত্তি; ব্যাংক ও fintech প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক অংশগ্রহণ; সহজ ব্যবহারকারী অভিজ্ঞতা।

ভারতের অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে একটি সতর্কতাও দেয়। UPI-এর বিশাল সাফল্যের সঙ্গে বাজারে কয়েকটি বড় অ্যাপের অতিরিক্ত প্রভাব এবং প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে UPI-ভিত্তিক পেমেন্টে বাজার ঘনত্ব ও প্রতিযোগিতা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো—একটি জাতীয় পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম সফল হলেও বাজারে প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন এবং ছোট সেবাদাতাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

কেনিয়ার M-Pesa: ব্যাংকবিহীন জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল অর্থনীতি

কেনিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ব্যাংকিং অবকাঠামো সীমিত থাকা সত্ত্বেও মোবাইল মানি সেবা দেশটির আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। World Bank-এর Digital Finance Country Snapshot অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কেনিয়ার প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং দেশটিতে মোবাইল মানি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কেনিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, ডিজিটাল পেমেন্টের সাফল্যের জন্য সবসময় প্রচলিত ব্যাংকিং অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করতে হয় না। মোবাইল ফোন, সহজ ব্যবহার এবং বিস্তৃত এজেন্ট নেটওয়ার্কও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।

বাংলাদেশে MFS-এর বিস্তার ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। বাংলা কিউআর এই ভিত্তিকে ব্যাংকিং ও অন্যান্য পেমেন্ট সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও গভীর হতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: জাতীয় QR থেকে আন্তঃদেশীয় পেমেন্ট

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে QR পেমেন্ট ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো—এক দেশের নাগরিক অন্য দেশে ভ্রমণ করলে নিজ দেশের পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহার করে স্থানীয় QR কোড স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।

বাংলাদেশের জন্য এটি ভবিষ্যতের একটি বড় সম্ভাবনা। পর্যটন, প্রবাসী বাংলাদেশি, সীমান্ত বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক QR interoperability নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক QR পেমেন্টের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা নিষ্পত্তি, বিনিময় হার, AML/CFT compliance, গ্রাহক সুরক্ষা এবং আন্তঃদেশীয় ডেটা ব্যবস্থাপনার মতো জটিল বিষয় সমাধান করতে হবে।

প্রধান চ্যালেঞ্জ: QR আছে, কিন্তু ব্যবহার কতটা?

বাংলা কিউআর-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো ‘merchant onboarding’ এবং ‘active usage’-এর পার্থক্য।

একজন ব্যবসায়ীর কাছে QR কোড থাকা মানেই তিনি নিয়মিত QR পেমেন্ট গ্রহণ করছেন না। অনেক ক্ষেত্রে QR কোড দোকানে প্রদর্শিত হলেও গ্রাহক নগদে অর্থ প্রদান করেন। ফলে ভবিষ্যতে সাফল্য পরিমাপের জন্য শুধু কতটি QR কোড বিতরণ হয়েছে তা নয়, বরং কতটি সক্রিয়, মাসে কতবার ব্যবহার হচ্ছে এবং কত মূল্যমানের লেনদেন হচ্ছে—এসব সূচক প্রকাশ করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলা কিউআর-এর মাধ্যমে প্রায় ৬৬ লাখ লেনদেন হলেও এটি National Payment Switch Bangladesh-এর মোট লেনদেনের তুলনায় এখনও ছোট অংশ।

অতএব, পরবর্তী পর্যায়ে নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত:

QR distribution → active usage → habitual usage → digital financial ecosystem
অর্থাৎ শুধু QR বিতরণ নয়; ব্যবহারকে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তা: সবচেয়ে বড় আস্থার পরীক্ষা

ডিজিটাল পেমেন্টের সঙ্গে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ে। ভুয়া QR কোড, QR code replacement, phishing, OTP প্রতারণা এবং social engineering-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত—‘গ্রাহক সুরক্ষা আগে, প্রযুক্তি পরে’।

প্রতিটি QR পেমেন্টের আগে গ্রাহককে স্পষ্টভাবে মার্চেন্টের নাম, অর্থের পরিমাণ এবং প্রাপকের পরিচয় দেখতে দিতে হবে। ভুল পেমেন্ট, প্রতারণা এবং disputed transaction-এর জন্য দ্রুত ও কেন্দ্রীভূত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা থাকা দরকার।

সাইবার নিরাপত্তা গবেষণায় QR-ভিত্তিক ব্যবস্থায় spoofing এবং QR replacement-এর মতো ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ফলে শুধু ব্যাংকিং অ্যাপ নিরাপদ হলেই হবে না; QR প্রদর্শনের ভৌত ও ডিজিটাল পরিবেশও নিরাপদ করতে হবে।

ডিজিটাল বৈষম্য: সবচেয়ে বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি শহর ও গ্রামের মধ্যে সমানভাবে বিকশিত হয়নি। স্মার্টফোন, ইন্টারনেটের গতি, ডিজিটাল literacy এবং নারীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগে বৈষম্য রয়েছে।

অতএব, বাংলা কিউআরকে শুধু শহরের shopping mall, restaurant এবং বড় ব্যবসায় সীমাবদ্ধ রাখলে এর সামাজিক সম্ভাবনা অপূর্ণ থাকবে।

গ্রামীণ বাজার, কৃষিপণ্য বিক্রয়, পরিবহন, ক্ষুদ্র দোকান, হাট-বাজার এবং সরকারি সেবায় বাংলা কিউআর-এর ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষায় সহজ প্রশিক্ষণ, প্রতারণা সম্পর্কে সচেতনতা এবং ব্যবহারকারী সহায়তা কেন্দ্র তৈরি করা জরুরি।

নীতিগতভাবে কী করা উচিত?

বাংলা কিউআরকে সফল করতে পাঁচটি নীতিগত বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, সক্রিয় ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ করতে হবে। শুধু নিবন্ধিত মার্চেন্ট নয়; সক্রিয় মার্চেন্ট, মাসিক লেনদেন, গড় লেনদেনের পরিমাণ, ব্যর্থ লেনদেন এবং অভিযোগের তথ্য প্রকাশ করা উচিত।

দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য চার্জ যুক্তিসঙ্গত রাখতে হবে। অত্যধিক চার্জ হলে ব্যবসায়ীরা নগদ অর্থ গ্রহণে ফিরে যেতে পারেন।

তৃতীয়ত, দ্রুত settlement নিশ্চিত করতে হবে। instant settlement-এর সুবিধা সারা দেশে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে।

চতুর্থত, একটি কেন্দ্রীভূত consumer protection framework দরকার। গ্রাহক যেন না জানেন—সমস্যা হলে ব্যাংক, MFS, PSP নাকি payment switch-এর কাছে অভিযোগ করবেন—এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না।

পঞ্চমত, data governance-এর শক্তিশালী কাঠামো দরকার।

ডিজিটাল পেমেন্টের তথ্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য মূল্যবান; কিন্তু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: বাংলা কিউআর থেকে ‘ডিজিটাল আর্থিক পরিচয়’

বাংলা কিউআর ভবিষ্যতে কেবল payment acceptance tool হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি বৃহত্তর ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোতে পরিণত হতে পারে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিক্রয় তথ্য, ব্যাংক হিসাব, MFS লেনদেন এবং ঋণ পরিশোধের ইতিহাস সমন্বিতভাবে ব্যবহৃত হলে বিকল্প credit scoring system তৈরি করা সম্ভব। এতে যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত জামানত দিতে পারেন না, তারা ভবিষ্যতে তাদের ডিজিটাল ব্যবসায়িক ইতিহাসের ভিত্তিতে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

সরকারি ফি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পরিবহন, ইউটিলিটি বিল, কর এবং অন্যান্য সেবায় বাংলা কিউআর-এর ব্যবহার আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতিগত পদক্ষেপগুলোও জাতীয় পর্যায়ে বাংলা কিউআর বাস্তবায়নকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলা কিউআর বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ। এর প্রাথমিক সাফল্য ইতোমধ্যে দৃশ্যমান—প্রায় ৯.৬৩ লাখ মার্চেন্ট, ৪৬টি ব্যাংক, ৭টি MFS এবং ৪টি PSP-এর অংশগ্রহণ একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হবে—মানুষ কতটা নিয়মিত এটি ব্যবহার করছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কতটা উপকৃত হচ্ছে এবং ডিজিটাল লেনদেন কতটা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হচ্ছে।

ভারতের UPI দেখিয়েছে, আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা ও সহজ ব্যবহার ডিজিটাল পেমেন্টকে দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত করতে পারে। কেনিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মোবাইলভিত্তিক অর্থনীতি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের পেমেন্ট ব্যবস্থা শুধু জাতীয় নয়, আন্তঃদেশীয়ও হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য তাই বাংলা কিউআর একটি বড় সম্ভাবনা—কিন্তু এটি নিজে কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। এর সফলতা নির্ভর করবে নীতি, প্রযুক্তি, বাজার প্রতিযোগিতা, গ্রাহক সুরক্ষা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সমন্বয়ের ওপর।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘ডিজিটাল পেমেন্টের সংখ্যা বাড়ানো’ নয়; বরং এমন একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী, স্বচ্ছ, আন্তঃপরিচালনযোগ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে একজন বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গ্রামের ক্ষুদ্র দোকানদার—সবাই একই আর্থিক অবকাঠামোর সুবিধা পেতে পারেন।

সঠিক নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের আস্থা নিশ্চিত করা গেলে বাংলা কিউআর শুধু একটি পেমেন্ট ব্যবস্থা হবে না; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির আনুষ্ঠানিকীকরণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।

লেখক: ড. প্রহল্লাদ চন্দ্র দাস
অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

*মতামত লেখকের নিজস্ব।