সাম্প্রতিক
তেল-চিনি ও ডিমের বাড়তি দামে নাজেহাল ক্রেতা শাহজালালের বিমানবন্দরের ইডিকে হুমকি: জামায়াতের আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ, আটক ৭০০ ১০ কোটি ব্যারেল তেল-ডিজেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত জি-৭ দেশগুলোর অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার ‘পথিকৃৎ’ হারালাম, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পদের উৎস কী, ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন হাসনাতের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশের বেশি ডেঙ্গুতে ৯ মাসে প্রাণ গেল ২৫০ জনের মধ্যপ্রাচ্যের পথে নতুন রণতরী, ১০ হাজার মার্কিন সেনা: ইরান যুদ্ধ কি আরও তীব্র হচ্ছে? অক্টোবরে বৃষ্টি কমবে, কমবে তাপমাত্রাও; তবে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা
Skip to content

রাজনীতি কি ক্ষমতার জন্য, নাকি মানুষের জীবন বদলানোর জন্য?

আমাদের রাজনীতি, ধর্মনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষানীতিতে একটি বিষয় গভীরভাবে অনুপস্থিত—গঠনমূলক কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপনের মানসিকতা। আমরা বক্তৃতা করি, ওয়াজ মাহফিল করি, সমাবেশ করি, বিক্ষোভ করি, মিছিল করি, মানববন্ধন করি; কখনও কখনও কথিত লংমার্চও করি। এসব কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাভাবিক উপায় হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসবের পরিণতিতে মানুষের জীবন কতটা বদলেছে?

আমাদের বেকারত্ব কি কমেছে? নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এসেছে? মূল্যস্ফীতির চাপ কি কমেছে? রাজধানীর যানজট কি সহনীয় হয়েছে? আদালতের মামলাজট কি কমেছে? আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি হয়েছে? শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের মান বেড়েছে? সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের বিপুল অদক্ষ জনশক্তি কি দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হয়েছে?

যদি এসব মৌলিক প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না থাকে, তাহলে আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাফল্য মাপব কী দিয়ে?

প্রতিবাদ প্রয়োজন, কিন্তু নির্মাণও প্রয়োজন

গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্য বা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে মানুষকে কথা বলতেই হবে। মিছিল, সমাবেশ ও বিক্ষোভ কখনও কখনও পরিবর্তনের জন্য জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্রতিবাদ নিজে কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। প্রতিবাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমস্যার সমাধান।

যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যেতে চায়, তার কাছে তাই শুধু এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়—কত মানুষ তার সমাবেশে এল? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: ক্ষমতায় গেলে সে কী নির্মাণ করবে?

কতটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে? কীভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে? কীভাবে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াবে? কীভাবে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করবে? কীভাবে হাসপাতাল ও বিদ্যালয়ের মান উন্নত করবে? কীভাবে আদালতে বছরের পর বছর চলা মামলা কমাবে? কীভাবে শহরের যানজট ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা করবে?
রাজনীতির আসল পরীক্ষা হওয়া উচিত এসব প্রশ্নের উত্তর।

পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও চীনের অভিজ্ঞতা এই আলোচনায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অবশ্য দেশগুলোর ইতিহাস, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, জনসংখ্যা, ভূগোল ও আন্তর্জাতিক অবস্থান এক নয়। তাই তাদের উন্নয়ন মডেল হুবহু বাংলাদেশে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
তবু একটি সাধারণ শিক্ষা পাওয়া যায়: তারা দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদনশীলতা, শিক্ষা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, শিল্প, রপ্তানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে রেখেছে।

দক্ষিণ কোরিয়া একসময় যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দরিদ্র দেশ ছিল। পরে শিক্ষা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ওপর জোর দিয়ে দেশটি বৈশ্বিক শিল্প ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়।

সিঙ্গাপুরের প্রাকৃতিক সম্পদ খুব সীমিত। কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ, বন্দর, অবকাঠামো, শিক্ষা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের অর্থনীতিকে রূপান্তর করেছে।

চীনের ক্ষেত্রেও গত কয়েক দশকে অবকাঠামো, শিল্প, শিক্ষা, প্রযুক্তি, রপ্তানি ও মানবসম্পদে বিপুল বিনিয়োগ তার অর্থনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়েছে।

জাপানের পুনর্গঠনও দেখিয়েছে—ধ্বংসস্তূপ থেকেও একটি দেশ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্পশৃঙ্খলা ও উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে উঠে দাঁড়াতে পারে।

এসব দেশের সাফল্যের পেছনে রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল না—এমন নয়। কিন্তু বিতর্কের পাশাপাশি কাজের ধারাবাহিকতা ছিল।

আমাদের সমস্যাটি কোথায়?

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও তিন দেশই দীর্ঘ সময় ধরে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংঘাত, বৈষম্য, প্রশাসনিক জটিলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক শক্তির একটি বড় অংশ বহু সময় ধরে ক্ষমতা অর্জন ও ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থেকেছে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক স্লোগানের আড়ালে চলে গেছে।

ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নীতি ও প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক পরিবর্তন হয়নি।

এক সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে, পরবর্তী সরকার সেটি বন্ধ বা পরিবর্তন করেছে। একটি দল একটি নীতিকে সমর্থন করেছে, বিরোধী অবস্থানে গিয়ে তার বিরোধিতা করেছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় জাতীয় উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে ছাপিয়ে গেছে।
ফলে প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি রাষ্ট্র পরিচালনাকে পাঁচ বছর মেয়াদি ক্ষমতার প্রকল্প হিসেবে দেখব, নাকি প্রজন্মব্যাপী জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখব?

ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেরও নতুন দিশা প্রয়োজন

একই প্রশ্ন ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ওয়াজ মাহফিল, ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক সমাবেশ মানুষের নৈতিক চেতনা জাগাতে পারে। কিন্তু যদি নৈতিকতার সঙ্গে বাস্তব মানবকল্যাণের সম্পর্ক তৈরি না হয়, তাহলে তার সামাজিক প্রভাব সীমিত থেকে যায়।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, এতিম ও দরিদ্র মানুষের পুনর্বাসন, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে ধর্মীয় চেতনা বাস্তব সামাজিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে।

ধর্মের মূল্য শুধু বক্তৃতায় নয়; মানুষের জীবনে তার কল্যাণকর প্রভাবেও প্রকাশ পাওয়া উচিত।

শিক্ষানীতিই হতে পারে পরিবর্তনের কেন্দ্র

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন শিক্ষাক্ষেত্রে। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়। একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন মানুষ তৈরি করবে যারা চিন্তা করতে পারে, কাজ করতে পারে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে এবং পরিবর্তিত অর্থনীতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যদি দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হয়, তাহলে সেটিই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে। আর যদি তারা শিক্ষিত হয়েও কর্মদক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে জনসংখ্যার সম্ভাবনা সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
তাই শিক্ষাকে কর্মসংস্থান, শিল্পনীতি, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

রাজনীতির নতুন মাপকাঠি

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজনীতিবিদকে শুধু জিজ্ঞাসা করা হবে না—আপনি কত বড় সমাবেশ করতে পারেন?
জিজ্ঞাসা করা হবে—
আপনি কতটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন?
কতজন তরুণকে দক্ষ করে তুলতে পারেন?
কতটি বিদ্যালয়ের মান উন্নত করতে পারেন?
কতটি হাসপাতালকে কার্যকর করতে পারেন?
কত দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে পারেন?
কীভাবে কৃষক, শ্রমিক ও উদ্যোক্তার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারেন?
কীভাবে একটি শহরকে বাসযোগ্য করতে পারেন?

এগুলোই হওয়া উচিত রাজনীতির কর্মসম্পাদনের মাপকাঠি।

ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব

রাজনীতি ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম হতে পারে; কিন্তু ক্ষমতার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনকল্যাণ।
মিছিল করা সহজ; একটি দক্ষ প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা কঠিন। বক্তৃতা দেওয়া সহজ; একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো কঠিন। সমাবেশ করা সহজ; একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বদলে দেওয়া কঠিন। স্লোগান দেওয়া সহজ; বছরের পর বছর একটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন।

কিন্তু জাতি এগোয় কঠিন কাজের মাধ্যমেই।

আমাদের তাই প্রতিবাদের রাজনীতি থেকে নির্মাণের রাজনীতিতে, স্লোগানের রাজনীতি থেকে সমাধানের রাজনীতিতে, এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতা থেকে রাষ্ট্রগঠনের প্রতিযোগিতায় যেতে হবে।

একটি রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে না যে সে কতবার ক্ষমতায় এসেছে। তার সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে—তার শাসনামলে মানুষের জীবন কতটা উন্নত হয়েছে।

জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই: ইতিহাসের গতিপথ শুধু বক্তৃতা, মিছিল ও স্লোগান দিয়ে পরিবর্তিত হয় না। পরিবর্তন আসে যখন একটি সমাজ তার মানবসম্পদ, প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীল শক্তিকে সংগঠিত করে বাস্তব ফল সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশেরও এখন সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে।

আমরা আর কতদিন রাজনীতি করব ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য? কবে রাজনীতি করবো দেশ গড়ার জন্য, জনগণের ভাগ্য বদলের জন্য?

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দি নিউ নেশন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক।