সাম্প্রতিক
২৫ বছর আগে ১ অক্টোবরের নির্বাচনে যেভাবে বড় জয় পেয়েছিল বিএনপি অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো ‘অভিযান’ চালানোর পরিকল্পনা নেই সরকারের: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপির এমপি মিষ্টির পদত্যাগপত্র গৃহীত, সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা ক্যালিফোর্নিয়ায় বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের ৩২ অঙ্গরাজ্যে কেন নয়? চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ১৫ বছর চালাবে বিদেশি অপারেটর, চুক্তি অনুমোদন অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা ৪৬ হাজার কোটি টাকায় মেট্রোরেলের ভূগর্ভস্থ-উড়ালপথ নির্মাণের অনুমোদন ৪৫৯২ জনবল নিয়ে সাইবার পুলিশ ইউনিটের যাত্রা শুরু, থাকবেন ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টো অ্যানালিস্ট অবরোধে অস্থির ফ্রান্স: শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, বন্ধ ১৬০টির বেশি স্কুল একটি দলের ‘অপশক্তি’ অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে: প্রধানমন্ত্রী
Skip to content

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যের পথে নতুন রণতরী, ১০ হাজার মার্কিন সেনা: ইরান যুদ্ধ কি আরও তীব্র হচ্ছে?

আরব সাগরে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন জাহাজের ফ্লাইট ডেকে মার্কিন নৌবাহিনীর নাবিকরা একটি যুদ্ধবিমানের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স

ইরানের কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় বিমানবাহী রণতরীসহ নতুন করে স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে আরও কয়েক হাজার মার্কিন সেনা। নতুন এই সামরিক শক্তি মোতায়েনের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ রোববার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। এর পরদিন মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা দেয় ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ)। এই ইউনিটে রয়েছে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নৌ ও স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েনের ফলে নাবিক ও মেরিনসহ মোট ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে তিন বিমানবাহী রণতরী

ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে এসব সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। নতুন মোতায়েনের অংশ হিসেবে রয়েছে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ। সম্প্রতি এই বহরের সঙ্গে ইউএসএস চোসিন নামের একটি ক্রুজারও যুক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া রয়েছে ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড অ্যাম্ফিবিয়াস রেডিনেস গ্রুপ। এই বহরে উভচর অবতরণকারী জাহাজ ইউএসএস জন পি মার্থা ও ইউএসএস অ্যাঙ্কোরেজ রয়েছে।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের আশপাশে তিনটি বিমানবাহী রণতরী এবং দুটি উভচর সামরিক ইউনিট অবস্থান করবে। তার ভাষ্য, এভাবে সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করা হলে প্রয়োজনের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে আরও বেশি সামরিক বিকল্প থাকবে।

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, নতুন মোতায়েন করা বহরে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকেই অবস্থান করা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার সঙ্গে আরও সামরিক শক্তি যুক্ত হচ্ছে।

পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাতে নুরি জানান, কূটনৈতিক আলোচনা যে দিকেই এগোক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক বিকল্পগুলো প্রস্তুত রাখাই নতুন মোতায়েনের অন্যতম উদ্দেশ্য। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও বর্তমানে মোতায়েন করা সামরিক সরঞ্জাম প্রত্যাহারের পরিকল্পনা পেন্টাগনের নেই।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছেন, ট্রাম্প নতুন হামলার নির্দেশ দিলে মার্কিন বাহিনী ‘প্রস্তুত’ রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক উপস্থিতি

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরেই সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। আল জাজিরার প্রতিবেদনে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, অঞ্চলটির অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে।

এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে।

১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে লেবানন সংকটের সময় মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবারের মতো মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। ওই সময় লেবাননে সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ হাজার মেরিন ও সেনাসদস্য অবস্থান করেছিলেন।

বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার সেনা ছিল। বড় স্থায়ী ঘাঁটির পাশাপাশি ছোট ছোট সামরিক অবস্থানেও এসব সেনা মোতায়েন রয়েছে।

ইরান যুদ্ধের আগে কী সামরিক শক্তি পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র?

ওপেন সোর্স গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও সামরিক উড়োজাহাজ পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেদনে এটিকে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াক্স), এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে এসব উড়োজাহাজ রওনা হচ্ছে। পাশাপাশি কার্গো বিমান ও মাঝ আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারের সহায়তাও রয়েছে। তাদের মতে, এই তৎপরতা নিয়মিত মোতায়েনের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিতে পারে।

গত মার্চে উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও মার্কিন সেনা পাঠানোর নির্দেশ দেয় পেন্টাগন। এর মধ্যে ছিল ইউএসএস ট্রিপোলিকে কেন্দ্র করে ট্রিপোলি অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ ও ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট, ইউএসএস বক্সারকে কেন্দ্র করে বক্সার অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ ও ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট এবং নর্থ ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার সেনা।

দুটি মেরিন ইউনিট মিলিয়ে এ অঞ্চলে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক মোতায়েন করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৭ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন মোতায়েনের বার্তা কী?

নতুন করে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি রয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমাবর্ষণ আরও বাড়ানো হতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি তা বলতে পারেননি।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করার কৌশল হিসেবেও নতুন সামরিক মোতায়েন করা হয়ে থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক আলোচনা কোথায়?

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে এখনো আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনের সাইডলাইনে কাতারের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্যতম জটিল ইস্যু হয়ে ওঠে।

আলোচনায় ইরান কাতারের মাধ্যমে সাত দিনের একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করে। এতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনা শুরুর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং লেবানন ও ইয়েমেনকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তবে ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অন্যান্য বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, প্রস্তাবে এমন কিছু বিষয় ছিল, যা তিনি এক বছর আগেও অনুমোদন করতেন না এবং এখনো করবেন না।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এনবিসিকে বলেন, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তার ভাষ্য, এসব নিষেধাজ্ঞার সবই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও যুক্ত। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সাতটি প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এনবিসিকে বলেন, আবার যুদ্ধ শুরু করতে পুরোপুরি প্রস্তুত ইরান। পরে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ বিক্রি করতে নিউইয়র্কে আসিনি। আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছি।’

ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি

সবশেষ বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সংঘাত খুব শিগগিরই শেষ হবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

টেক্সাসের ডেন্টনে পিটারবিল্ট মোটরসের একটি কারখানায় দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে হয় ‘খুব সঠিক ও বুদ্ধিমান’ কিছু করতে হবে, নয়তো তাদের জন্য বেশিদিন টিকে থাকা কঠিন হবে।

কোনো চুক্তি হলে ইরান সেটি মেনে চলবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করলে সেটি চুক্তির শর্ত মানবে; কিন্তু ইরানের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে।

ফলে একদিকে যখন পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আরও বাড়ছে। তিনটি বিমানবাহী রণতরী, দুটি উভচর সামরিক ইউনিট এবং হাজার হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের এই সমন্বয়কে ঘিরেই এখন প্রশ্ন—ওয়াশিংটন কি শুধু সামরিক বিকল্প প্রস্তুত রাখছে, নাকি ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বড় পরিসরে নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে?

(প্রতিবেদনটি আল জাজিরা থেকে নেওয়া)

এনএনবাংলা/