সাম্প্রতিক
‘নাইন ইলেভেন’-যে দিনের পর বদলে গেছে মুসলিমদের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী, চাপে সাধারণ মানুষ আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক ইউনিট বন্ধ, দেশে বাড়ল লোডশেডিং গুলশানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মিছিল; ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেপ্তার ২ ভারতের সঙ্গে হাসিনার ১০১ চুক্তিতে ‘দেশের স্বার্থ’ খুঁজছে সরকার: চিফ হুইপ এইচ-১বি ভিসায় ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড বাতিলের উদ্যোগ ডেঙ্গুতে আরও ২ মৃত্যু, হাম উপসর্গে প্রাণ গেল ৩ শিশুর ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন কার্যক্রম দেশে অক্টোবরে শুরু হচ্ছে স্মার্টফোন উৎপাদন, পাওয়া যাবে ২–৩ হাজার টাকায় আহত সেনা কর্মকর্তাকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী
Skip to content

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

গাজায় গণহত্যা কি আরও ভয়াবহ ভবিষ্যতের ‘ট্রেলার’?

ছবি: রয়টার্স

গাজায় ইসরাইলি হামলা ও ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নিপীড়ন কি কেবল একটি যুদ্ধের অংশ, নাকি এর আড়ালে আরও ভয়াবহ কোনো ভবিষ্যতের প্রস্তুতি চলছে—এমন প্রশ্ন তুলেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর একটি প্রতিবেদনের লেখক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওতে অতিরিক্ত ওজনের ফিলিস্তিনি বন্দিদের একটি সারি কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমে কারাগারে ঢুকতে দেখা যায়। তাদের মাথার ওপর খাবার ও শিক্ষার স্বপ্নের বুদবুদ দেখানো হয়। পরে বেন-গভির সেই স্বপ্নের বুদবুদ সরিয়ে দিলে বন্দিরা কঙ্কালসার ও কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসে।

ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য দর্শকদের বসার জায়গাসহ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের স্থান তৈরির উদ্যোগও নিয়েছেন বেন-গভির। সম্প্রতি উত্তর ইসরাইলের ডেমন কারাগার পরিদর্শনের সময় দুর্বল পরিস্থিতির অভিযোগ করা নারী বন্দিদের তিনি উপহাস করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন একটি উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারের চারপাশে পরিখা খনন এবং সেখানে টহলের জন্য কুমির রাখার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থন রয়েছে এসব কর্মকাণ্ডে। সামরিক আদালতে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিবেচিত এবং প্রাণঘাতী হামলায় দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান চালুর যে আইন বেন-গভির সমর্থন করেছেন, সেটিও দেশটিতে জনসমর্থন পাচ্ছে।

বদলে যাচ্ছে ফিলিস্তিন নিয়ে বৈশ্বিক মনোভাব

গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনের লেখক মনে করেন, ২০১৭ সালের দিকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিশ্ব গণমাধ্যম ও জনমতের একটি পরিবর্তন স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফিলিস্তিন নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধগুলোতে আগের মতো বিদ্বেষপূর্ণ চিঠি আসত না। ফিলিস্তিনিদের অধিকার সমর্থনে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোও তুলনামূলকভাবে কম বাধার মুখে পড়ত।

তখন মনে হচ্ছিল, ইসরাইল ও তার সমর্থকদের দীর্ঘদিনের প্রচার করা কিছু ধারণার ওপর মানুষের বিশ্বাস কমছে। এসব ধারণার মধ্যে ছিল—ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে ‘পশ্চিমা মূল্যবোধের’ ধারক, দেশটির সেনাবাহিনী বিশ্বের ‘সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী’ এবং ইসরাইল কেবল আত্মরক্ষার জন্যই সামরিক পদক্ষেপ নেয়।

অথচ একই সময়ে গাজায় নিয়মিত হামলা এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত ছিল।

একসময় ধারণা করা হতো, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরাইলের আচরণ সম্পর্কে গণতান্ত্রিক পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ যথেষ্ট পরিমাণে জানতে পারলে তারা নিজ নিজ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম মানতে বাধ্য হবে এবং শেষ পর্যন্ত ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের সমান অধিকার নিয়ে বসবাসের মতো একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ সামনে আনা হতো। কারণ, কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক চাপ দেশটির বর্ণবাদবিরোধী পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

গাজায় হামলা আরও প্রকাশ্য ও ভয়াবহ

তবে নৈতিক ও যুক্তির লড়াইয়ে জয় আসছে বলে মনে হওয়ার বিপরীতে ফিলিস্তিনে দখলদারিত্ব আরও দ্রুত এগিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বেড়েছে এবং গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলাও হয়েছে আরও ঘন ঘন ও প্রকাশ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন বছর ছিল সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের হত্যা, আহত ও বাস্তুচ্যুত করার মাত্রা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যাকে প্রতিবেদনের লেখক ‘নিশ্চিত গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ গাজা থেকে জাতিগত নির্মূলের প্রতি তার অঙ্গীকারের কথা বলেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরের এক ইহুদি বসতি স্থাপনকারী বিবিসিকে বলেছেন, একজন ইহুদির জীবন ১ কোটি ফিলিস্তিনির জীবনের সমান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইসরাইলিদের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ছে। টেলিভিশন বিতর্কের বিশ্লেষক থেকে শুরু করে ইসরাইলি সেনাদের কেউ কেউ ফিলিস্তিনিমুক্ত ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা প্রকাশ্যে বলছেন ও করছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ছবি: আলজাজিরা

সব জেনেও ইসরাইলকে সহায়তা?

প্রতিবেদনের লেখকের মতে, ফিলিস্তিনে কী ঘটছে, তা এখন বিশ্বের মানুষ জানে এবং বারবার প্রত্যাখ্যানও করছে। এরপরও পশ্চিমা অনেক গণতান্ত্রিক দেশ গাজায় যুদ্ধ চলার সময় ইসরাইলকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়েও ফিলিস্তিনিদের নিয়ে উপহাসের সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সময়ে শত শত ইসরাইলি ট্রাক গাজার ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছে। এতে যুদ্ধাপরাধের সম্ভাব্য প্রমাণও সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিজ দেশের লাখো মানুষের বিক্ষোভ দমাতে পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো বিচারব্যবস্থায় আপস করছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করছে—এমন অভিযোগও তোলা হয়েছে।

যদিও কেউ কেউ দেরিতে হলেও ইসরাইলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, প্রতিবেদনের লেখকের মতে, এসব অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে আরও অনেক আগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল।

‘এটি যদি গণহত্যা না হয়, তাহলে গণহত্যা খুব বেশি দূরে নয়’

২০১৪ সালে প্রতিবেদনের লেখক ফিলিস্তিনবিষয়ক রাসেল ট্রাইব্যুনালের জুরির সদস্য ছিলেন। গাজায় ছয় বছরের মধ্যে ইসরাইলের তৃতীয় যুদ্ধের পর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘এটি যদি গণহত্যা না হয়, তাহলে গণহত্যা খুব বেশি দূরে নয়।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে তার প্রশ্ন—গাজায় চলমান এই গণহত্যা কি সামনে আসতে যাওয়া আরও বড় কিছুর ‘ট্রেলার’?

লেখকের মতে, গণহত্যা যেমন অপ্রত্যাশিত ছিল না, তেমনি পুরোনো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর এ বিষয়ে বিশেষ আপত্তি না থাকাও বিস্ময়ের নয়। নিজেদের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পশ্চিমা দেশগুলো কয়েক দশক ধরে অস্ত্র উৎপাদন, গোয়েন্দা ও নজরদারি প্রযুক্তিতে ইসরাইলের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। সন্ত্রাস দমন, জিজ্ঞাসাবাদ এবং বেসামরিক জনগণ নিয়ন্ত্রণের কৌশলেও পশ্চিমা দেশগুলো ইসরাইলের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

ইসরাইলি অস্ত্রের অন্যতম প্রচারও ছিল, এগুলো বাস্তবে ‘পরীক্ষিত ও ব্যবহৃত’।

গাজা কি ভবিষ্যতের একটি নকশা?

প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা এখানেই। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের গণহত্যা যখন সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক ক্ষমতাকাঠামো শুধু তা দেখছেই না, বরং সুরক্ষা দিচ্ছে এবং পরবর্তী সময়ে সবকিছু গুছিয়ে নিতেও সহায়তা করছে।

এ কারণে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, গাজা হয়তো একটি গবেষণা ও উন্নয়ন অনুশীলন, একটি নকশা কিংবা ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করা কোনো উদাহরণে পরিণত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ব এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কিছু জনগোষ্ঠীকে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠছে। তাদের কেউ কেউ এমন এলাকায় বসবাস করে, যা সম্পত্তি উন্নয়নকারীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

লেখকের মতে, এই যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের বিষয় নয়। এটি আধিপত্য ও শ্রেষ্ঠত্বের এমন কিছু মতাদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা বিশ্বের মানুষ, নাগরিক সমাজ এবং টিকে থাকা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হুমকি তৈরি করছে।

আপাতত ফিলিস্তিনিরাই সেই সম্মুখসারিতে। তারাই নিহত, আহত, নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিরাই বিশ্বকে এমন একটি পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাওয়া থেকে আটকে রাখছে, যে পৃথিবী ইসরাইলের আদলে নতুন করে তৈরি হতে পারে।

এনএনবাংলা/