শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের আদালত

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠাতে ঢাকার করা অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভারতের আদালতই নেবে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’।
ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা কূটনৈতিকভাবে নেওয়া হবে না। আদালতের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত কি না, তা যাচাই করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, আদালতের প্রক্রিয়ায় মূলত যাচাই করা হবে—শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ কি না।
আরেক ভারতীয় কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস, তাই আমি ডিসেম্বরেই ফিরে যেতে চাই।”
২০২৪ সালের আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। আন্দোলন দমনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তার দল আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বানের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বিষয়টি ভারতের ‘প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি’ অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য থাকলে তা জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ যে প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠিয়েছে, তার সঙ্গে ২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্রও সংযুক্ত রয়েছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের উদ্ধৃত করে আরও জানিয়েছে, দিল্লিতে ভারত সরকারের একটি সেইফ হাউজ থেকে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন শেখ হাসিনা। মাঝে মধ্যে তিনি সরাসরি তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। এমনকি নিয়মিত টেবিল টেনিস খেলছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।
আওয়ামী লীগের সদস্যদের দাবি, ভারতের কোনো আদালতে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু হলে ওই রায়কে বিভিন্ন দিক থেকে চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে। এর মধ্যে একটি যুক্তি হতে পারে—রায়টি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেওয়া হয়েছে এবং সে সময় মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।
২০১৩ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘আদালত কর্তৃক ঘোষিত সাজা’ কার্যকর করার জন্য অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ফেরত দেওয়ার ‘বাধ্যবাধকতা’ রয়েছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের ‘বিচারিক কর্তৃপক্ষ’ বিষয়টি দেখভাল করবে।
চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ অপরাধগুলোকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। তবে খুন, নরহত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং খুনে প্ররোচনার মতো ১২টি অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
এ ক্ষেত্রে ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনের বিধানও প্রাসঙ্গিক। ওই আইনে পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার, পাসপোর্ট ও ভিসা (সিপিভি) বিভাগ প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর। মন্ত্রণালয় চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজন মনে করলে একজন তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে।
ওই ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন, আসামিকে হস্তান্তরের যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে, তাহলে তিনি প্রত্যর্পণের সুপারিশ করতে পারেন। অন্যদিকে, তদন্ত শেষে ম্যাজিস্ট্রেট যদি দেখেন যে বিদেশি রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে প্রাথমিক কোনো প্রামাণ্য ভিত্তি বা ‘প্রাইমা ফেসি’ নেই, তাহলে তিনি আসামিকে অব্যাহতি দিতে পারেন।
ফলে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দেশটির আদালতের আইনি প্রক্রিয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এনএনবাংলা/
