তারেক রহমান ভারত সফরে আগ্রহী, তবে আগে চূড়ান্ত করতে হবে ‘অর্জনের এজেন্ডা’

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যত দ্রুত সম্ভব ভারত সফরে যেতে আগ্রহী। তবে সফর শেষে দেশে ফিরে জনগণের সামনে তুলে ধরার মতো সুনির্দিষ্ট অর্জন ও সাফল্য নিশ্চিত করতে চান তিনি। এ কারণে ভারত সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট এজেন্ডা চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দ্য হিন্দুকে বাংলাদেশের এক কূটনৈতিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ভারতের আমন্ত্রণে বহুপক্ষীয় ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমান অংশ না নিলেও এর অর্থ এই নয় যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক অবদান ও ত্যাগ স্বীকার করা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ভারতকে তিনি এড়িয়ে চলতে চান।
কূটনৈতিক ওই কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানেন, আগামী নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরের শুরুর দিকে দ্বিপক্ষীয় কাঠামোয় নয়াদিল্লি সফরের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত নবায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তা না হলে আগামী ডিসেম্বরের শেষে চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিবিড় আলোচনা করে সফরের এজেন্ডা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। তবে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শুরু হয়নি। ঢাকার ধারণা, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন সফরের একটি ‘চলমান অর্জন’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরোপ করা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, স্থলবন্দরগুলোর ব্যবহার এবং পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় চালুর মতো বিষয়গুলোতেও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
জ্বালানি খাতেও ভারত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে ঢাকা। বর্তমানে বাংলাদেশ জ্বালানি সরবরাহে তীব্র সংকটের মধ্যে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় ভারত সহায়তা করলে তা দুই দেশের মধ্যে আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কূটনৈতিক ওই কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন, বাংলাদেশ বাণিজ্যিক ও কনস্যুলার বিষয়গুলোকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের মতো কঠিন রাজনৈতিক ইস্যু থেকে আলাদাভাবে বিবেচনা করছে।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলেও এটি কার্যকর ছিল।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বছরের শেষ হওয়ার আগে চুক্তিটি নবায়ন করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করাও উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে ভারতে জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডিইউয়ের সংসদ সদস্য সঞ্জয় ঝার মতো কেউ কেউ চুক্তিটির নবায়নের বিরোধিতা শুরু করেছেন। তাদের দাবি, এই চুক্তি বিহারকে কোনো সুবিধা দেয় না।
কূটনৈতিক ওই কর্মকর্তার মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর এমনভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন, যাতে এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আবার পূর্ণ সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাহলেই দিল্লি সফর শেষে দেশে ফিরে তিনি উল্লেখযোগ্য অর্জন তুলে ধরতে পারবেন।
তিনি জানান, তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংলাপ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এদিকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী একাধিক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করছেন। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও তিনি বৈঠক করেছেন। তবে তারেক রহমানের ভারত সফরের এজেন্ডা চূড়ান্ত করতে আমলাদের পর্যায়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কূটনৈতিক ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের এজেন্ডা তৈরির বিষয়ে বাংলাদেশ ‘মুক্তমনা’। কিছু বিষয়ে অবস্থান শিথিল করার সুযোগ রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে ঢাকার।
দ্য হিন্দুকে ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বাংলাদেশ আশা করে ভারত বিষয়টি বিবেচনায় রাখবে যে, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার অভিযোগগুলো যৌক্তিক নয়, কারণ তারেক রহমান একজন নির্বাচিত নেতা।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার দলের সদস্য ও সমর্থকদের অংশগ্রহণে নতুন করে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ ভারত বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশ সন্তুষ্ট। এটিকে ভারতের পক্ষ থেকে একটি গঠনমূলক বার্তা হিসেবে দেখছে ঢাকা।
এ প্রসঙ্গে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিএনপির নেতারা মনে করেন, ২০১৮ সালে ভারত লর্ড আলেকজান্ডার কার্লাইলকে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। সে সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
লর্ড কার্লাইলের শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। সে সময় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের প্রধান হিসেবে দিল্লিতে ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। এ সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আমলাদের পর্যায়ে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যেই গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (এফসিসি) ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সহিংস অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলে এবং ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘটনায় ‘ক্ষোভ’ প্রকাশ করে।
এনএনবাংলা/
