বেসরকারি ব্যাংকের ৮২% খেলাপি ঋণ মাত্র ১০ ব্যাংকে

দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশই জমা হয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংকে। জুন শেষে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৪২ কোটি টাকাই রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকে। অর্থাৎ বেসরকারি ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৮২ শতাংশের বেশি এই ১০ ব্যাংকের ঘাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির সর্বশেষ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
খেলাপি ঋণে শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক
খেলাপি ঋণের বোঝায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৯ হাজার কোটি টাকা, যা বেসরকারি ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫২ শতাংশের বেশি ছিল খেলাপি।
এর পরেই রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৯৭ শতাংশের বেশি ইতোমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
এক্সিম ব্যাংকে খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে।
এই পাঁচ ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বেসরকারি ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানে।
শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় আরও যারা
খেলাপি ঋণে শীর্ষ ১০ বেসরকারি ব্যাংকের তালিকায় আরও রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক।
এর মধ্যে আইএফআইসি ও ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৯৭ শতাংশেরও বেশি খেলাপি।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
খেলাপি ঋণে শীর্ষ দশে থাকা পাঁচটি ব্যাংক আগে বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের (এস আলম) নিয়ন্ত্রণে ছিল। ব্যাংকগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।
এই পাঁচ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৩০ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ শীর্ষ ১০ বেসরকারি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশই রয়েছে এই পাঁচ ব্যাংকে। আর পুরো বেসরকারি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের ৫৩ দশমিক ২ শতাংশের বেশি এই পাঁচ ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত।
এ ছাড়া এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। আইএফআইসি ব্যাংক ছিল বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণে। ন্যাশনাল ব্যাংক ছিল সিকদার গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের নিয়ন্ত্রণে এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক ছিল প্রিমিয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবালের নিয়ন্ত্রণে।
তাদের সবাই আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর বাইরে এবি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বিএনপি সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের হাতে।
খেলাপির সঙ্গে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতির চাপ
খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রভিশন ঘাটতিও। খেলাপি ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দিতে ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করার কথা, দুর্বল অনেক ব্যাংক তা পুরোপুরি সংরক্ষণ করতে পারছে না।
জুন শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৬৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রকৃত প্রভিশন ছিল ২ লাখ ১৬ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ফলে পুরো বেসরকারি ব্যাংক খাতে নিট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ইসলামী ব্যাংকে। প্রয়োজনীয় প্রভিশনের তুলনায় ব্যাংকটির ঘাটতি ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রায় ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।
এনএনবাংলা/
