ইতালীয় গণমাধ্যমে বাঁধনের ওপর হামলার খবর, তদন্তে বিশেষ পুলিশ ‘দিগোস’

৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে গিয়ে বাংলাদেশি অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা দেশটির মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। ইতালির শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন সংবাদপত্র, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
ইতালীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের জেরে ভেনিসের কাছের মেস্ত্রে শহরে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি বর্তমানে ইতালির বিশেষ পুলিশ বাহিনী ‘দিগোস’ (Digos) তদন্ত করছে।
রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেন আজমেরী হক বাঁধন।
ইতালীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং বাঁধনের বক্তব্য অনুযায়ী, মেস্ত্রে শহরের যে হোটেলে তিনি অবস্থান করছিলেন, সেখানে কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক প্রথম দফায় তাঁকে হেনস্তা করেন। পরে কাছের একটি পার্কে ভাই ও ছোট শিশু ভাতিজাকে নিয়ে ঘুরতে গেলে তাঁর ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলার ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাঁধনের সমর্থনের কারণে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় তাঁকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে গালিগালাজ ও হেনস্তা করা হয়।
বাঁধন ইতালীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, হামলার সময় তাঁর দিকে পানি ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারা হয়। তাঁর ফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে থাকা ছোট শিশুর সামনেই তাঁকে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন হয়রানিমূলক গালিগালাজ করা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন অভিনেত্রী।
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করে বাঁধন বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল ওরা আমাকে মেরেই ফেলবে।’
যেভাবে খবরটি প্রকাশ করেছে ইতালীয় গণমাধ্যম
ইতালির প্রথম সারির দৈনিক ইল গাজ্জেত্তিনো (Il Gazzettino)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাঁধনকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে তাঁর স্বদেশিরাই গালিগালাজ ও হেনস্তা করেছেন। ঘটনাটি ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
করিয়ারে দেল্লা সেরা (Corriere della Sera) বাঁধনের নারী অধিকার বিষয়ক ভূমিকা ও অভিনয়জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
সেকোলো দি ইতালিয়া (Secolo d’Italia) ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতের ময়দানে পরিণত করা উচিত নয়। ইতালিতে রাজনৈতিক মতাদর্শ পোষণের স্বাধীনতা থাকলেও হুমকি বা সহিংস আচরণ মেনে নেওয়া হবে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বামপন্থী সংবাদপত্র ইল ম্যানিফেস্টো (Il Manifesto)-তে বলা হয়েছে, একদিকে লিডো দ্বীপে বাঁধনের অভিনয় প্রশংসিত হচ্ছে, অন্যদিকে মেস্ত্রেতে তিনি স্বদেশিদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন—যা উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলাকারীরা নিজেদের ‘বঙ্গবন্ধুর অনুসারী’ হিসেবে দাবি করেছে।
এ ছাড়া ইতালির প্রধান বার্তা সংস্থা আনসা (ANSA) এবং দেশটির শীর্ষ দৈনিক লা রিপাবলিকা (La Repubblica) পৃথকভাবে ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক কারণেই অভিনেত্রীকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার কিছু অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভস্ট্রিম করা হয়েছিল বলেও জানানো হয়েছে।
জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল ফ্যানপেজ (Fanpage) ও ইমোলাওজি (ImolaOggi)-তেও ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে।
সিসিটিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও খতিয়ে দেখছে দিগোস
ইতালির রাজনৈতিক ও বিশেষ অপরাধ তদন্ত সংস্থা ‘দিগোস’ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও পরীক্ষা করছে। এসব ভিডিও ও ফুটেজের মাধ্যমে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
আজমেরী হক বাঁধন জানিয়েছেন, তিনি ইতালির স্থানীয় আইন অনুযায়ী এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেবেন। কোনো ধরনের হুমকি বা চাপের কাছে তিনি নীরব থাকবেন না বলেও জানিয়েছেন অভিনেত্রী।
এনএনবাংলা/
