আশির দশকে ফিরছে সোশ্যাল মিডিয়া, এআই ছবির ট্রেন্ডে নেটিজেনরা

টাইম মেশিন এখনো আবিষ্কার হয়নি। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের কল্যাণে যেন সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলছেন নেটিজেনরা।
নিজেদের বর্তমানের ছবি বদলে আশির দশকের ফ্যাশন, সাজসজ্জা ও নান্দনিকতায় তৈরি করছেন নতুন ছবি। ইনস্টাগ্রামে শুরু হওয়া এই ট্রেন্ড এখন ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকেও। শোবিজ তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবহারকারী—অনেকেই অংশ নিচ্ছেন এই নস্টালজিক ট্রেন্ডে।
এআইয়ের চোখে আশির দশকের ফ্যাশন
আশির দশক ছিল পপ কালচার ও ফ্যাশনে বড় ধরনের পরিবর্তনের সময়। সেই সময়ের পোশাক, চুলের স্টাইল ও সামগ্রিক নান্দনিকতাকেই এআই-জেনারেটেড ছবিতে নতুন করে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।
এআইয়ের তৈরি ছবিতে পুরুষদের আশির দশকের ফ্যাশনে দেখা যাচ্ছে বেলবটম বা ফ্লেয়ারড প্যান্ট, প্রিন্টেড ও ওভারসাইজড কলারের শার্ট এবং ডেনিম জ্যাকেট। চেহারায় থাকছে ঘন গোঁফ ও ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা এলোমেলো চুল।
অন্যদিকে নারীদের সাজে দেখা যাচ্ছে চওড়া পাড়ের শাড়ি, পোলকা ডট ড্রেস, পাফ করা উঁচু চুল এবং চোখে গাঢ় কাজল ও আইলাইনার। সব মিলিয়ে ছবিগুলোতে ফুটে উঠছে আশির দশকের পরিচিত ফ্যাশন ও সৌন্দর্যচর্চার ছাপ।
ছবিতেও পুরোনো দিনের আমেজ
শুধু পোশাক ও চেহারার পরিবর্তন নয়, এআই ছবির কালার গ্রেডিংয়েও রাখা হচ্ছে আশির দশকের আবহ। সেপিয়া টোন, ফিল্ম ক্যামেরার গ্রেইন এবং পোলারয়েড ক্যামেরার মতো কিছুটা অনুজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করে ছবিগুলোকে পুরোনো দিনের ফটোগ্রাফের মতো করে তোলা হচ্ছে।
ফলে বর্তমান সময়ে তোলা একটি ছবিও দেখতে অনেকটা আশির দশকের কোনো পুরোনো অ্যালবাম থেকে উঠে আসা ছবির মতো মনে হচ্ছে।
যেভাবে শুরু হলো এআইয়ের এই ট্রেন্ড
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেকোনো ট্রেন্ডের মতো এআই-জেনারেটেড ভিনটেজ ছবির এই প্রবণতাও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের কয়েকজন ইনফ্লুয়েন্সার প্রথম দিকে এ ধরনের ছবি ব্যবহার করেন। পরে তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে ট্রেন্ডটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের কিছু ইনফ্লুয়েন্সার প্রথমে এই ট্রেন্ড ব্যবহার শুরু করেছিলেন। তবে ঠিক কার হাত ধরে এটির যাত্রা শুরু হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বর্তমানে চ্যাটজিপিটি ও জেমিনাইয়ের মতো এআই টুল সহজলভ্য হওয়ায় নিজের ছবি বিভিন্ন সময় ও স্টাইলের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। ফলে নতুন কোনো এআই ট্রেন্ড শুরু হলে তা খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
কীভাবে নিজেকেও নিয়ে যাবেন আশির দশকে?
নিজের আশির দশকের ধাঁচের ছবি তৈরি করতে এপিকের (EPIK) মতো এআই-চালিত রেট্রো ফিল্টার অ্যাপ ব্যবহার করা যায়। তবে চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো এআই টুল ব্যবহার করেও আরও নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়ে এ ধরনের ছবি তৈরি করা সম্ভব।
ছবির সঙ্গে আশির দশকের পোশাক, চুলের স্টাইল, ক্যামেরার ধরন, আলো, ব্যাকগ্রাউন্ড ও কালার গ্রেডিংয়ের নির্দেশনা দিলে কাঙ্ক্ষিত সময়ের আবহ আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়।
কেন অতীতে ফিরতে চাইছেন মানুষ?
এই ট্রেন্ডের জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু বিনোদন নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক কারণও রয়েছে বলে মনে করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানের দ্রুতগতির ও যান্ত্রিক জীবনে মানুষ প্রায়ই ক্লান্ত বোধ করেন। আশির দশককে অনেকের কাছে এমন একটি সময় হিসেবে মনে হয়, যখন ইন্টারনেট বা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল না এবং জীবনযাপন ছিল তুলনামূলক ধীর ও সরল। সেই সময়ের প্রতি মানুষের একধরনের আকর্ষণ থেকেই তৈরি হচ্ছে নস্টালজিয়া।
এর পাশাপাশি ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রভাবও এই ট্রেন্ডকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ব্যক্তিদের এমন ছবি দেখে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যেও ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা FOMO তৈরি হতে পারে। ফলে অন্যরা অংশ নিচ্ছেন দেখে অনেকেই ট্রেন্ডে যুক্ত হচ্ছেন।
নস্টালজিয়াই কি এই ট্রেন্ডের মূল আকর্ষণ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আশির দশকের ছবি পোস্ট করার মধ্য দিয়ে ব্যবহারকারীরা মূলত নিজেদের জন্য একটি কৃত্রিম নস্টালজিক অভিজ্ঞতা তৈরি করছেন। মজার বিষয় হলো, এই ট্রেন্ডে অংশ নেওয়া অনেকের জন্মই নব্বইয়ের দশকে বা তার পরে। অর্থাৎ তারা নিজেরা আশির দশকের সেই সময়টি দেখেননি।
তবু আশির দশকের পোশাক, সিনেমা, গান, ফ্যাশন ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ থেকেই তারা নিজেদের সেই সময়ের চরিত্রে কল্পনা করছেন। একই সঙ্গে সত্তরের দশকের শেষভাগ বা আশির দশকে জন্ম নেওয়া অনেক মানুষও এই ট্রেন্ডে অংশ নিচ্ছেন—যাদের জন্য এটি অনেকটা পুরোনো দিনের স্মৃতিকে নতুনভাবে ফিরে পাওয়ার সুযোগ।
এনএনবাংলা/
