সাম্প্রতিক
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপদের জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন চ্যালেঞ্জ করে ১১ এমপির রিট এই বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না: রাষ্ট্রপতি দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান শফিউদ্দিনকে দুদকে তলব ১২ বছর পর সাগর-রুনি হত্যা মামলায় নতুন ক্লু, মিলল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ‘কানেকশন’ ডেঙ্গুতে একদিনে রেকর্ড আক্রান্ত, মৃত্যু ৩ নেপালে ধ্বংসস্তূপের নিচে ৩ দিন, জীবিত উদ্ধার ৬ বছরের শিশু থার্ড টার্মিনাল চালু করতে আরও ৯০২ কোটি টাকা প্রয়োজন: বিমানমন্ত্রী যতটা পাপ কামিয়েছি, সব ধুয়েমুছে সুন্দরভাবে মরতে চাই: পপি গেন্ডারিয়ায় সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলি, নারীসহ গুলিবিদ্ধ ৩ আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে দিল্লির সেমিনার পুলিশি বাধায় বাতিল, কী জানা যাচ্ছে?
Skip to content

গ্রামে কৃষি কাজ কম, ঢাকায় রিকশাই কেন অনেকের শেষ ভরসা?

গ্রামের জমি ও জীবিকা হারানো অধিকাংশ মানুষ ঢাকায় এসে রিকশা চালানোকে বেছে নিচ্ছেন পেশা হিসাবে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান ও শহরগুলোতেও চাপ বাড়ছে। তবে এই চাপের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে রাজধানী ঢাকায়। জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ১ দশমিক ২২ শতাংশ। এই বৃদ্ধির গতি আগের তুলনায় কমলেও প্রতিবছর মোট জনসংখ্যায় যুক্ত হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ।

এর বড় একটি অংশের গন্তব্য রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা। বর্তমানে বৃহত্তর ঢাকায় প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষের বসবাস। ঢাকামুখী মানুষের এ ঢল অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে ‘মেগাসিটি’ ঢাকার জনসংখ্যা ৫ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে কর্মসংস্থান, পরিবহন, আবাসন ও নাগরিক সেবায় রাজধানীর ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ্রাম থেকে ঢাকায় কেন মানুষের ঢল

ঢাকার বর্তমান বাসিন্দাদের বড় একটি অংশের জন্ম রাজধানীতে নয়। জীবিকা ও উন্নত সুযোগের আশায় তারা দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন। আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় আসা মানুষের অনুপাতে বরিশাল বিভাগের অবস্থান সবচেয়ে ওপরে। বরিশালের প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন। এরপর রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ।

এ ছাড়া কুড়িগ্রাম, রংপুর ও জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ঢাকামুখী হয়েছেন। নদীভাঙন, বন্যা ও উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততার কারণে জমি ও জীবিকা হারানো মানুষও রাজধানীতে এসে নতুন করে কাজের সন্ধান করছেন। এসব সর্বস্ব হারানো অভাবগ্রস্তদের বড় একটি অংশই তরুণ।

কৃষিতে কমছে কাজের সুযোগ

মানুষের ঢাকামুখী হওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক। গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি কৃষি হলেও আগের মতো বিপুল শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না এই খাত। একদিকে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে জমি খণ্ডিত হয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় অনেক ধরনের শারীরিক শ্রমের প্রয়োজনও কমেছে।

দেশর শিল্প কারখানা, সেবা খাত ও বেসরকারি বিনিয়োগের বড় অংশ এখনও ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে গ্রাম ও অনেক জেলা শহরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় মানুষের সামনে কার্যত দুটি পথ থাকে—সীমিত আয়ের অনিশ্চিত কাজ নিয়ে নিজ এলাকায় থাকা, অথবা রাজধানীতে এসে কাজের সন্ধান করা।

ঢাকায় এসে অনেকের জন্য সহজে প্রবেশযোগ্য আয়ের পথ হয়ে উঠছে রিকশা চালানো। বিশেষ দক্ষতা বা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ছাড়াই এই পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকায় গ্রাম থেকে আসা বহু মানুষের কাছে রিকশাই হয়ে উঠছে জীবিকার শেষ অবলম্বন।

জলবায়ু ও দুর্যোগ বাড়াচ্ছে চাপ

নদীভাঙন, বন্যা ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ গ্রামীণ মানুষের জীবিকা সংকটকে আরও তীব্র করছে। জমি হারানো বা কৃষিকাজের সুযোগ কমে যাওয়ার পর অনেক পরিবার বিকল্প আয়ের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। আর সেই দরিদ্র, অদক্ষ মানুষগুলোর অন্যতম প্রধান গন্তব্য হচ্ছে ‘জাদুর শহর’ খ্যাত ঢাকা, তাদের বিশ্বাস ঢাকায় কোনা না কোন কাজ, আশ্রয় এবং দুবেলা খাবার পাওয়া যাবেই।

ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান তৈরির বিকল্প নেই

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো—গ্রাম ও জেলা শহরে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করা না গেলে ঢাকামুখী মানুষের প্রবাহ থামানো কঠিন। এ জন্য রাজধানীর বাইরে শিল্পপার্ক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল ও হালকা শিল্পের বিকাশে সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিল্প ও বিনিয়োগের বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি এসব এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত সড়ক যোগাযোগ এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কিছু সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষায়িত হাসপাতাল রাজধানীর বাইরে স্থানান্তর বা বিকেন্দ্রীকরণ করা গেলে ঢাকার ওপর মানুষের নির্ভরতা কমানো সম্ভব।

রিকশা নয়, দরকার বিকল্প কর্মসংস্থান

রাজধানীর যানজট, বায়ুদূষণ ও হাসপাতালের ওপর বাড়তে থাকা চাপকে শুধু নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একমুখী উন্নয়ন ব্যবস্থা—যেখানে সুযোগ ও কর্মসংস্থানের বড় অংশ কয়েকটি নগরকেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত, অথচ বহু জেলায় পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ নেই।

গ্রাম ও জেলা শহরে মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত জীবিকার সন্ধানে মানুষ ঢাকায় আসবে। আর তাদের একটি অংশের জন্য রিকশা চালানোসহ অনানুষ্ঠানিক পেশাই হয়ে থাকবে সহজলভ্য কর্মসংস্থানের প্রধান পথ। তাই এটি শুধু গ্রামীণ দরিদ্র শ্রমশক্তির ঢল বা যানজটের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কাঠামোর প্রশ্ন। দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে হলে সচেতন ও কার্যকর সরকারি পদক্ষেপের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সুযোগ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হবে।

এনএনবাংলা/