সাম্প্রতিক
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফের বাড়ল তেলের দাম রাশিয়ায় নতুন করে ৫০ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে উত্তর কোরিয়া, দাবি জেলেনস্কির হাসিনা ও হাদি হত্যার আসামিদের দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি ঢাকার চাষের মাছে কাদা-কাদা গন্ধ হয় কেন, কী করলে গন্ধ থাকবে না? জুলাই-পরবর্তী সাংস্কৃতিক পরিসর: পরিবর্তনের ইঙ্গিত কোথায়? সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি সামিরা-আজিজের, দাবি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দেশে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি, এক বছরে ৩০ বার বন্ধ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র
Skip to content

দেশে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি, এক বছরে ৩০ বার বন্ধ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র

ছবি: নিউ নেশন মাল্টিমিডিয়া

তীব্র গরমে দেশজুড়ে যখন চলছে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি, তখন দেশের অন্যতম বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রামপাল বন্ধ ও চালুর খেলায় মেতেছে। যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লার সংকটে গত এক বছরে কেন্দ্রটির কোনো না কোনো ইউনিট ৩০ বার বন্ধ হয়েছে। এতে বাগেরহাটের রামপালের বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল) নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছে সরকার। বিপুল অঙ্কের বিদেশি ঋণে নির্মিত কেন্দ্রটির এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও সচিব গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এক বৈঠকে রামপাল কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামানাথ পূজারীর কাছে বারবার কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে চান। এভাবে একটি কেন্দ্র চললে সরকারের কোনো ভাবমূর্তি থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কয়েক মাস ধরে সারা দেশে ব্যাপক লোডশেডিং চলছে। এ সময়ে রামপালের মতো কয়লাভিত্তিক মূলধারার বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে রামপাল কেন্দ্র বারবার বন্ধ হয়েছে। ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার (৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট) কেন্দ্রটি চালুর তিন বছরের মধ্যেই একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়েছে। এ কেন্দ্র নির্মাণে ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে ১৬০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। সেই ঋণের অর্থ এখন বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত এক বছরে কয়লার অভাবে তিনবার এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২৭ বার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোনো না কোনো ইউনিট বন্ধ হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই কয়লা সংকটের কারণে কেন্দ্রটির ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ৮ জুলাই সেটি আবার উৎপাদনে আসে। এর চার দিন পর ১২ জুলাই বন্ধ হয় ১ নম্বর ইউনিট। ১৬ জুলাই সেটি আবার চালু হয়।

১৯ জুলাই প্রথমে ২ নম্বর এবং পরে ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ওইদিন ১ নম্বর এবং পরদিন ২ নম্বর ইউনিট চালু করা হয়। ২১ জুলাই যান্ত্রিক ত্রুটিতে আবার বন্ধ হয় ১ নম্বর ইউনিট। একই দিন সেটি চালু হলেও ১৫ আগস্ট আবার বন্ধ হয়ে যায় এবং ওইদিনই পুনরায় চালু করা হয়। পরদিন আবার ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে একই দিনে চালু হয়। ২১ আগস্টও ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ ও চালু হয়।

এরপর ৩ সেপ্টেম্বর ও ৫ অক্টোবর ২ নম্বর ইউনিট আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৭ অক্টোবর ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই চালু করা হয়। ২০ অক্টোবর ২ নম্বর ইউনিট চালু হলেও ড্রেইন লাইন লিকেজের কারণে ২৫ অক্টোবর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন আবার চালু করা হয়। এক মাস দুটি ইউনিট ঠিকমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পর ৫ ডিসেম্বর হঠাৎ ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ৭ ডিসেম্বর সেটি চালু হয়। ২১ ডিসেম্বর আবার ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে ২৩ ডিসেম্বর চালু হয়।

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি আবারও বন্ধের কবলে পড়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। ওইদিন ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে পরদিন চালু হয়। ২২ জানুয়ারি ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে একই দিনে উৎপাদনে আসে। ২৭ ফেব্রুয়ারি আবার ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে একই দিনে চালু করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি চালু হয় ১ নম্বর ইউনিট। ১৪ মার্চ আবার বন্ধ হয় ২ নম্বর ইউনিট।

এরপর কিছুদিন স্বাভাবিকভাবে চলার পর ৭ এপ্রিল জেনারেটর সমস্যায় ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ১২ এপ্রিল এটি চালু হয়। ১৩ এপ্রিল বয়লার লিকেজের কারণে আবার ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ১৬ এপ্রিল সেটি চালুর পরই আবার বন্ধ হয়ে যায়। একই দিন আবার ইউনিটটি চালু করা হয়।

বয়লার সমস্যার কারণে ১৪ মে আবার ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ১৮ মে চালু হওয়ার পর সেটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ২৩ মে পুনরায় চালু করা হয়। এর দুই দিন পর, ২৫ মে, বয়লার সমস্যায় ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। ২৯ মে সেটি চালু হলেও ১৬ জুন আবার বন্ধ করে দিতে হয়। ২০ জুন চালু হওয়ার পর ২২ জুন আবার বয়লার সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায়। ২৪ জুন সেটি চালু হয়। এর তিন দিন পর ২৭ জুন একই সমস্যায় ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ৩০ জুন সেটি চালু করা হয়। এরপর জুলাইয়ে আবারও ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন বারবার বন্ধ হচ্ছে, তা দেখতে গত জুনে কেন্দ্রটি পরিদর্শনে যান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।

এ বিষয়ে মন্তব্য নিতে রামপাল কেন্দ্রের মুখপাত্র আনোয়ারুল আজিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত অর্থবছরে রামপাল রেকর্ড ৮ হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট।

রামপাল কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ পিডিবি কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ১৪ টাকার বেশি। অথচ সরকার তা বিক্রি করে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা দরে। বাকি অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হয়। সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো রামপাল কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ পায়।

বর্তমানে রামপাল কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও), হেড অব প্ল্যান্টসহ ১২ জন ভারতীয় কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি সিএফও ও মহাব্যবস্থাপক (জিএম)সহ নয়জন ভারতীয় কর্মকর্তা কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই ভারত চলে যান। এতে বিপাকে পড়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে সরকার তাদের আর গ্রহণ করেনি। পরে ভারতের এনটিপিসি অন্য কর্মকর্তাদের পাঠায়।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা ৫০-৫০ শতাংশ করে ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) এবং বাংলাদেশের পিডিবির।

এনএনবাংলা/