Skip to content

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন, শিল্পকারখানা ও পরিবহনে অচলাবস্থা

ছবি এআই সাহায্যে তৈরি

তীব্র গরমের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট একসঙ্গে প্রকট হয়ে ওঠায় দেশজুড়ে জনজীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা, পরিবহন, সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহক—সবখানেই তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। গ্যাসের ঘাটতির কারণে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনও। কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, আবার কোথাও ২০ থেকে ২৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট। ওই সময়ে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৫৭৭ মেগাওয়াট। তবে শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। এ সময় সরকারি হিসাবেই তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। রাত ১টায় ঘাটতি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সংকটের মূল কারণ গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রধান প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কয়েক সপ্তাহ আগেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। রোববার বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস পাওয়া গেছে মাত্র ৬৮ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

সংকটের পেছনে রয়েছে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের দুর্ঘটনা। গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে, যেখানে চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটির মেরামতের কাজ চললেও কবে নাগাদ এটি চালু হবে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি পেট্রোবাংলা।

গ্যাসের এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পাঞ্চলে। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও ফতুল্লার গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় চাপের বদলে মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই গ্যাস মিলছে। অথচ স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ১৫ পিএসআই। ফলে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, স্পিনিং ও সিরামিক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অনেক কারখানা দিনে উৎপাদন বন্ধ রেখে রাতে কাজ চালানোর চেষ্টা করছে। সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠাতে না পেরে উদ্যোক্তারা অতিরিক্ত ব্যয়ে বিমানপথে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে ডিবিএল গ্রুপের সব পোশাক কারখানা এবং শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিকেএমইএ ও বিটিএমএ অবিলম্বে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছে।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক চালক রাতভর অপেক্ষা করেও মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকার গ্যাস নিয়ে ফিরছেন। ফলে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের সংখ্যা কমে গেছে। যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।

আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও বেড়েছে। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেটিও কার্যকর সমাধান হয়ে উঠছে না। ফলে একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

বরগুনায় লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও

দীর্ঘদিনের লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সোমবার বরগুনায় বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেন ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পায়রা ও তালতলী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেলায় হয়েও বরগুনার মানুষ সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছেন। জেলা শহরে প্রায় ৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র সাড়ে ৩ মেগাওয়াট। পল্লি এলাকাতেও একই অবস্থা। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

কিশোরগঞ্জে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গ্যাস বন্ধ

জাতীয় গ্যাস সংকটের মধ্যেই কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশে তিতাসের মূল সঞ্চালন পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জেলার গ্যাস পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইপলাইন মেরামতের কাজ চলায় আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।

সোমবার কটিয়াদীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নিয়ে চুনাপাথরের কারখানা স্থাপনের চেষ্টা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, অবৈধ সংযোগ নেওয়ার সময় পাইপলাইনে বড় ধরনের লিকেজ তৈরি হয়। এরপর থেকেই বিপুল পরিমাণ গ্যাস বের হয়ে যাচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

তিতাসের কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় আট হাজারের বেশি গ্রাহক এই সংকটে পড়েছেন। পাইপলাইন মেরামত শেষ হলেও জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের ঘাটতি থাকায় দ্রুত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এনএনবাংলা/