ক্ষমা না চাইলেও একাত্তরের অবস্থান মেনে নিয়েছে জামায়াত: আইনমন্ত্রী

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও অবস্থান সঠিক ছিল না—সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে দলটি পরোক্ষভাবে তা মেনে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) আয়োজিত অনুষ্ঠানে বইটি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি জামায়াতের ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং ব্যারিস্টার রাজ্জাকের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
‘ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া নয়’
বইয়ে উঠে আসা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তার প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, ওপর থেকে কোনো ইসলামিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে রাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করাই ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ।
তিনি বলেন, ইসলামিক শাসন চাপিয়ে দেওয়ার ধারণা একটি ভ্রান্ত নীতি। সমাজের ভেতর থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ে উঠবে এবং পরিচালিত হবে—এটাই প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়ে বিষয়টি এভাবেই উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাজ্জাকের ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চিন্তার সঙ্গে তিনি দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। তবে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও মূল্যবোধের জায়গা থেকে বইটিকে তিনি একজন জীবন্ত মানুষের এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে করেছেন। তাঁর মতে, রাজ্জাক যেভাবে সমাজকে দেখেছেন এবং যে জীবনদর্শন ধারণ করেছেন, বইটি তারই প্রতিফলন।
অনুষ্ঠানে জামায়াত নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়েও মন্তব্য
অনুষ্ঠানে জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্ব ও সুপ্রিম কোর্টে দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের উপস্থিতি প্রত্যাশা করেছিলেন বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, তারা উপস্থিত থাকলে বইয়ের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ বা সমালোচনা করতে পারতেন।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো বইয়ের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া যেমন জরুরি নয়, তেমনি সমালোচনা গ্রহণ করতে না পারাও সঠিক নয়। বইটিতে বিএনপি সম্পর্কেও সমালোচনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভিন্নমত গ্রহণের সক্ষমতা না থাকলে সমাজব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
‘২০১৬ সালে রাজ্জাকের প্রস্তাব গ্রহণ করলে অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো’
১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের মূল্যায়ন ও জাতির কাছে একটি বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তাবের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০১৬ সালে জামায়াত ওই বক্তব্যে স্বাক্ষর করলে দলটির অনেক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত।
তাঁর দাবি, জামায়াত বর্তমানে সেই বক্তব্যের আলোকে একটি অবস্থান মেনে নিয়েছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২-এ মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞার মধ্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের বিরোধিতাকারীদের প্রসঙ্গ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালে ওই আইনে সংশোধনী আনা হয় এবং ২০২৬ সালে বিষয়টি সংসদে আইন আকারে আনার প্রক্রিয়ায় বিশেষ কমিটিতে জামায়াতের নাম বাদ দেওয়ার দাবি তোলা হয়েছিল। সংশোধিত সংজ্ঞায় ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ’ ও ‘তৎকালীন নেজামে ইসলামী’ উল্লেখ করা হয় বলে জানান তিনি।

‘জামায়াত কোনো না ভোট দেয়নি’
আইনমন্ত্রী বলেন, সংশোধিত আইনটি সংসদে উপস্থাপনের পর ভোটাভুটিতে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সদস্য ‘না’ ভোট দেননি। তাঁর দাবি, এই সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই জামায়াত ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে রাজ্জাকের উত্থাপিত অবস্থানকে পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে রাজনৈতিক দর্শন ও নীতির আলোকে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে একটি বিবৃতি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটি তখন গ্রহণ করা হলে দলটির অনেক প্রশ্নের সমাধান হতে পারত। বর্তমানে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জামায়াত পরোক্ষভাবে সেই অবস্থান মেনে নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন রাজ্জাক
প্রসঙ্গত, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দলটির ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়েও এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাজ্জাকের ওই প্রস্তাব জামায়াত ২০১৬ সালে গ্রহণ করলে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে দলটির সামনে থাকা অনেক প্রশ্নের সমাধান হতে পারত।
‘পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজকে মানিয়ে নিতে হবে’
নতুন প্রজন্ম ও পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সামনে এগিয়ে যেতে হলে সমাজকে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান একটি প্রজন্মের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছে। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়েও পরিবর্তন ও রাজনৈতিক চিন্তার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্স অ্যান্ড গভর্নমেন্টের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক Right to Freedom-এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর ও সাবেক মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ।
এনএনবাংলা/
