মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগদান করলে আগে ঝুঁকি মূল্যায়নের তাগিদ দিলেন বিশেষজ্ঞরা
মক্কা প্রতিরক্ষা জোট বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন, সামরিক প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করতে পারে। তবে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সুষম সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ জোটের সদস্যপদ দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান কূটনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ঢাকার গুলশানের হোটেল লেক ক্যাসলে ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্সের তাৎপর্য এবং বাংলাদেশের বিকল্প’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (সিএসডিএস)। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন ।
আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই জোট বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন, সামরিক প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করতে পারে। তবে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সুষম সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গোলটেবিল বৈঠকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, ‘মক্কা জোটের গুরুত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মিয়ানমার পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হওয়া উচিত। মিয়ানমারের সাথে সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ওআইসি চ্যানেল সক্রিয় রাখতে বাংলাদেশের একটি আঞ্চলিক অংশীদার প্রয়োজন এবং পাকিস্তান এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।’ পাশাপাশি বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রেক্ষাপটে চীনও একটি প্রধান প্রভাবক বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাই ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশকে এ বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে অধ্যাপক শাহাব বলেন, মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে, তবে সৌদি আরব, উপসাগরীয় দেশসমূহ, ইরান এবং তুরস্কের মধ্যবর্তী পরিবর্তিত সম্পর্ক ঢাকার কূটনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশ মক্কা চুক্তির মাধ্যমে কতটা স্বার্থ সুরক্ষা করতে পারবে। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি।
২০২৪-পরবর্তী সময়ে প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়ন ও বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও ঢাকার জন্য উদ্বেগের কারণ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান বলেন, মক্কা চুক্তিটি মূলত তিনটি দেশের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর মূল বিধানগুলোর একটি হলো—কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা বাকি সব সদস্যের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে। জোটে যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশকে এর সম্ভাব্য দায়বদ্ধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে কোন পরিস্থিতিতে বলপ্রয়োগ করতে হতে পারে এবং এর ফলে কী ধরণের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হবে, তা আগে থেকেই জানা প্রয়োজন।’
এটি বাংলাদেশের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ এবং ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া চুক্তিটি বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং জাতিসংঘ সনদের সংশ্লিষ্ট নীতিগুলোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাও মূল্যায়ন করা দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান বলেন, মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ কাঠামো ও স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই এ নিয়ে এখনই অতিরিক্ত আশাবাদী না হয়ে বাংলাদেশের উচিত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের জন্য অপেক্ষা করা। আগামী কয়েক মাসে এই জোটের পরিধি খুব একটা বাড়ার সম্ভাবনা কম এবং এর ভবিষ্যৎ মূলত সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে।
লেফট্যানেন্ট জেনারেল (অব.) আমিনুল করিম বলেন, মক্কা চুক্তিকে সরাসরি ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা করা যুক্তিযুক্ত নয়। জোটটির সাংগঠনিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয় এবং সদস্য দেশগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনে ব্যস্ত।
তবে জোটটি বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু সুযোগ তৈরি করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের আর্থিক সম্পদ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে একটি শক্তিশালী বিমান বাহিনী ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।’
আমিনুল করিম আরও বলেন, ‘একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশকে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।’ একই সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও চীনের সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে পাকিস্তানের সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হুসাইন সৈয়দ বলেন, ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ, যা মুসলিম দেশগুলোর জন্য নতুন কৌশলগত বিকল্প তৈরি করতে পারে। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ঢাকার জন্য এটি একটি বিকল্প পথ হলেও বাংলাদেশের মূল নজর থাকা উচিত দক্ষিণ এশিয়ায়।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উচিত তাদের কৌশলগত, সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।’
মক্কা ও মদিনাকে বহিরাগত হুমকি থেকে রক্ষা করতেই এই জোটের মূল মনোযোগ থাকা উচিত এবং এটিকে মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার কোনো দ্বন্দ্বে ব্যবহার করা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
