সাম্প্রতিক
Skip to content

জোর করে শিক্ষকের পদত্যাগের বৈধতা নেই, পুনর্বহালের নির্দেশ হাইকোর্টের

ছবি এআই সাহায্যে তৈরি

কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কোনো আইনগত বৈধতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।

হাইকোর্ট বলেছেন, আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

আলকাছ উদ্দিন আহমেদের মামলায় রায়

‘মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এই রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের পুনর্বহালের পথ তৈরি হতে পারে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়। ওই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় দেন আদালত।

বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন। বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।

আদালতে রিটকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম।

রায়ে আদালত বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন বা বিধি জোরপূর্বক কিংবা চাপের মুখে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করে না।

যেভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়

মামলার বিবরণে জানা যায়, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এর পরদিন এ ঘটনায় কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আলকাছ উদ্দিন আহমেদ। পরে ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান তিনি।

একইসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিষয়টি অবহিত করে আইনি প্রতিকার ও হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

পরে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে বহাল করার নির্দেশ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তবে সেই আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।

রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি জোর করে নেওয়া ওই পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন আদালত। পরে চলতি বছরের ২০ আগস্ট আগের জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, প্রকৃতপক্ষে রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা ছিল না। এমনকি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি তার এমপিও অংশের বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে বা চাকরিতে বহাল করতে আইনিভাবে বাধ্য ছিল। ফলে তিনি অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহাল হওয়ার অধিকারী ছিলেন বলে আদালত উল্লেখ করেন।

আদালত আরও বলেন, আইন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে শিক্ষা বোর্ডের এখতিয়ার রয়েছে পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক প্রস্তাবিত যেকোনো শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন বা বাতিল করার। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও বোর্ডের রয়েছে।

সে অনুযায়ী শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রতি জারি করা নির্দেশনা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। ওই নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে পালন না করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল বলেও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন আদালত।

হাইকোর্ট বলেন, এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচারের নীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সমতার বিধানের পরিপন্থী। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট বিবাদীরা আইনগতভাবে বাধ্য। তাদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক অবহেলা এবং সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

নির্দেশনা না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

আদালত মনে করেন, একটি নির্দেশনাসহ রুল নিষ্পত্তি করা হলে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণ হবে। তাই বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে রিট আবেদনকারীকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রিটকারীকে পুনর্বহালে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশনা অমান্যকারী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে—পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের—যিনি পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সচিবের এমপিও বন্ধের মতো ব্যবস্থা।

এনএনবাংলা/