‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরোধিতা করুন’ ব্রিকস সম্মেলনে বার্তা শি জিনপিংয়ের

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরোধিতা করতে ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ব্রিকসের অন্যান্য দেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
ভারতের নয়াদিল্লিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত প্রসঙ্গে এসব কথা বলেন শি জিনপিং। তার মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থ রক্ষা করে না এবং এর ফলে ওই অঞ্চলের জনগণ গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ছে। খবর রয়টার্সের।
শি জিনপিং বলেন, পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় যথাযথ ভূমিকা পালনের জন্য চীন ব্রিকসের অন্যান্য সদস্যদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। চলমান যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলের মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ব্রিকস দেশগুলোর প্রতি সব ধরনের ‘সুরক্ষাবাদ’ প্রত্যাখ্যানের আহ্বানও জানান চীনা প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থাকে সমর্থন করা উচিত এবং সব ধরনের সুরক্ষাবাদ প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের বিরোধিতা করার আহ্বান জানান শি। তিনি ব্রিকসকে ‘গ্লোবাল সাউথের’ নেতৃত্বস্থানীয় জোট এবং উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীলতার একটি মডেল হিসেবে উল্লেখ করেন। জোটটির উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিদেশি নেতাদের নিজস্ব নিরাপত্তা দলের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সমন্বয় করে কাজ করছে।
সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি জিনপিং জানিয়েছেন, আগামী বছর চীন ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং ১৯তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবে।
যৌথ ঘোষণায় ঐকমত্য
ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন শুরুর আগে সদস্যদেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এতে কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সংঘাত নিরসনে ‘সংলাপ ও কূটনীতিকে’ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যৌথ ঘোষণায় কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্মেলনের আগে কয়েক দিন ধরে ব্রিকসের কূটনীতিকেরা যৌথ ঘোষণার ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত এমন একটি ভাষায় ঐকমত্য হয়েছে, যা ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—দুই দেশই মেনে নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
চলমান যুদ্ধের কারণে আগস্টে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। যুদ্ধের সময় আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটে। এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরান ও আমিরাতের মতপার্থক্যের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ফলে এবার সদস্যদেশগুলোকে একটি অভিন্ন অবস্থানে আনতে পারাকে ভারতের কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ভারতের ভারসাম্যের কূটনীতি
এবার ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলায় নয়াদিল্লি ‘সংলাপ ও কূটনীতিকে’ সমাধানের পথ হিসেবে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে ব্রিকস। জোটটির কয়েকটি দেশ বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব বেশি।
এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানো, বাণিজ্যিক বাধা কমানো এবং ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর জোর দিচ্ছে ভারত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল, ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
নয়াদিল্লির এবারের সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ ব্রিকসের নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
ব্রিকসের সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের ৪০ শতাংশের বেশি। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তাদের অংশ প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
এনএনবাংলা/
