কুবির আইন বিভাগে ৪ শিক্ষক দিয়ে ৭ ব্যাচের পাঠদান, শিক্ষক নিয়োগের দাবি শিক্ষার্থীদের
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আইন বিভাগে দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকটের কারণে একাডেমিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা, সময়মতো পরীক্ষা গ্রহণ এবং ফলাফল প্রকাশ। এর ফলে বিভাগটিতে ক্রমেই বাড়ছে সেশনজটের আশঙ্কা, যা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে একাডেমিক কার্যক্রম চালু হওয়া আইন বিভাগে বর্তমানে থাকা আটজন শিক্ষকের মধ্যে চারজনই রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে। ফলে অবশিষ্ট চারজন শিক্ষককে চলমান সাতটি ব্যাচের পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে। এ ছাড়াও পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় বাহিরের শিক্ষক দ্বারা কোর্স পরিচালনা করতে হচ্ছে, অনেক সময় শিডিউল না মেলায়ও বিপাকে পড়ছে শিক্ষার্থীদের।
তাছাড়া পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায়, বাকি শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত চাপের কারণে একাডেমিক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলা জানায় বিভাগ সংশ্লিষ্টরা। ফলে অচিরেই শিক্ষার্থীদের সময়মতো ফলাফল না পাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি সেশনজটে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের ২৩ জুন সেশনজট কমানোর দাবিতে বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিভাগে তালা ঝুলিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। পরে শিক্ষার্থীদের পক্ষে থেকে ছয়টি দাবি জানানো হলে, দাবি পূরণের আশ্বাস দেন বিভাগীয় প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) সাদিয়া তাবাসসুম, আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন এবং তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল।
সে অনুযায়ী একাডেমিক ক্যালেন্ডারে পরিমার্জন করে সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনমাফিক করা হয়েছেও বলে জানান শিক্ষার্থীরা। এবং যাবতীয় সংকট সমাধানে অতিদ্রুত শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো: বায়েজিদ হোসেন বলেন, ‘আইনের কোর্সের ক্লাস নিচ্ছে অন্য ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক। এতে করে ক্লাসের শিডিউলও মিলছে না, তাদের ডিপার্টমেন্টের ক্লাস শেষ করে আমাদের ডিপার্টমেন্টে আসেন ক্লাস করাতে, ফলে নিয়মিত ক্লাসও হচ্ছে না। এতে ঐ শিক্ষকদের সাথে আমাদের কানেক্ট করা কঠিন। আমাদের দুইটা কোর্সের ক্লাস নিচ্ছেন অন্য বিভাগের শিক্ষক, এদের একজন বিজনেস ফ্যাকাল্টির এবং অন্যজন সোশ্যাল সাইন্সের শিক্ষক।’
অভিযোগের সুরে বায়েজিদ হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা পাঁচ আগস্টের পর থেকে ডিপার্টমেন্টে শিক্ষক নিয়োগের কথা বলে আসছি। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো কোনো সুরাহা পাইনি।’
‘ভিসি স্যারের সাথে আমরা দেখা করেছি, তিনি আমাদের শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি ইউজিসির অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন’– যোগ করে বলেন বায়েজিদ।
শিক্ষক সংকটের মধ্যেই বিভাগটিতে রয়েছে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং ডক্টরেট ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংকট। বর্তমানে বিভাগটিতে থাকা শিক্ষকদের কারোরই নেই ডক্টরেট ডিগ্রি। এ ছাড়া আটজন শিক্ষকের প্রত্যেকেই সহকারী অধ্যাপক। ফলে সিনিয়র শিক্ষকের সংকটেও ভুগছে বিভাগটি।
এনিয়ে আইন বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী ইয়াসিন পাঠান সৈকত বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় আইন বিভাগে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটি দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। একটি স্বতন্ত্র অনুষদ হওয়া সত্বেও আইন অনুষদ একটি অবহেলিত অনুষদ। বর্তমানে আইন বিভাগে ৭টি ব্যাচের একাডেমিক কার্যক্রম চলমান, অথচ এর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪ জন।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিভাগে এখন পর্যন্ত কোনো প্রফেসর নেই, ৮ জন সহকারী অধ্যাপকের মধ্যে ৪ জন শিক্ষা ছুটিতে থাকায় শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। প্রত্যেক ব্যাচের প্রায় ৬০% কোর্স সম্পন্ন করতে হচ্ছে গেস্ট টিচারের মাধ্যমে। ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সেশনজটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমান প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের দাবি দ্রুত প্রফেসরসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, নতুন ক্যাম্পাসে স্বতন্ত্র অনুষদ বিল্ডিং বরাদ্দ ও পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা।’
আইন বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী যোবায়ের আহমেদও বিভাগে সংকটের পাশাপাশি সিনিয়র শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের বিভাগে আটজন শিক্ষকের মধ্যে চারজন শিক্ষা ছুটিতে চলে গেছেন। ফলশ্রুতিতে সেমিস্টারে কোর্সগুলো শেষ করতে আন্তঃবিভাগ ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর হতে হচ্ছে। বিভাগ চালু হওয়ার দশ বছরেও বিভাগে একজন অধ্যাপক নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ থেকে শিক্ষকবৃন্দের ক্লাস নিতে আসার কারণে আমাদের ক্লাসরুটিনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি নমনীয় হয়ে ওনাদের সুযোগ করে দিতে হয়। আমাদের বিভাগের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটতো না। আমাদের দাবি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভাগে অধ্যাপক অথবা সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে প্রত্যেকটি ব্যাচের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া।’
শিক্ষক সংকটের ফলে একজন শিক্ষকের উপর অতিরিক্ত চাপ পরার বিষয়টিকে তুলে ধরেন বিভাগটির বর্তমান বিভাগীয় প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) সাদিয়া তাবাসসুম। তিনি বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের পরেও আমাদের কার্যক্রম চলছে। শিক্ষার্থীরা আমাদেরকে যে ধরনের রোডম্যাপ দিয়েছে আমরা সেভাবেই কাজ করছি। শিক্ষক সংকটের কারণে আমাদের প্রত্যেক শিক্ষকই ৬টা করে কোর্স নিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাঁচ আগস্টের পরে তৎকালীন ভিসি হায়দার আলীর স্যার শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আশ্বাস দিলেও কেন শেষ পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ হয়নি এটা এখনো জানি না।’
এ বিষয়ে আইন অনুষদের ডিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এখন আপাতত পার্ট টাইম টিচার দিয়েছি। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি তো আমরা চাইলেই পারি না, ইউজিসির অনুমতি নিতে হয়। আমরা ইউজিসির কাছে নতুন টিচার চেয়েছি। বাজেট পিরিয়ড শেষ হয়ে যায় ৩০ এ জুন, এই সময়ের মধ্যে অনুমতি আনতে হয়, সময় পার হয়ে গেলে নতুন করে অনুমতি আনতে হয়। ফাঁকা পোস্ট এবং শিক্ষা ছুটির বিপরীতে দুইভাবেই শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে ইউজিসির কাছে অনুমতি চেয়েছি। অনুমতি পেলেই আমরা শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করব।’
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, ‘আইন বিভাগের শিক্ষক সংকটের বিষয়টি আমি জানি। আপাতত বাইরে থেকে গেস্ট টিচারের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আমরা ইউজিসির কাছে পদের জন্য আবেদন করেছি। আমাদের অর্গানোগ্রাম রেডি হয়েছে, অনুমতি পেলে আমরা যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করব।’
এনএনবাংলা/

