হিজাব ছাড়াই রাস্তায় তরুণীরা, ক্যাফে-রেস্তোরাঁ বন্ধ করছে ইরান সরকার

ইরানে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব আইন আবারও বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। দেশটির কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিকরা আইনটি কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে প্রকাশ্যে হিজাব না পরার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় আপাতত বড় ধরনের দমন অভিযান চালাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের তীব্র সময়েও সরকারি সমাবেশ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হিজাব ছাড়া বহু নারীকে দেখা গেছে। সে সময় সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে যুদ্ধ ও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিই ছিল প্রধান অগ্রাধিকার।
তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজাববিহীন নারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে হিজাব আইন না মানার অভিযোগে ক্যাফে, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার খবরও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ জুলাই তেহরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন প্রয়োগ না করার অভিযোগে অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পোশাকবিধি অমান্যের অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্টও ব্লক করা হয়েছে।
তেহরানের প্রসিকিউটর অফিস জানিয়েছে, কিছু ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় ‘অশালীনতা’ এবং অনুমোদিত পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপ্রচলিত বা অনুপযুক্ত পোশাক বিক্রির অভিযোগে কিছু দোকানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পূর্ব ইরানের দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশে ‘সামাজিক রীতি ও বাধ্যতামূলক হিজাব আইন’ লঙ্ঘনের অভিযোগে ১০টি ক্যাফে বন্ধ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মেহর নিউজ এজেন্সি।
চার বছর আগে তরুণী মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর ইরানে ‘ওম্যান, লাইফ, ফ্রিডম’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। অনুপযুক্ত পোশাক পরার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। পরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনটি কঠোরভাবে দমন করে কর্তৃপক্ষ।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২৪ সালের শেষ দিকে জানিয়েছিল, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্যকারী নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে ইরানি কর্তৃপক্ষ ক্রমবর্ধমান সহিংস দমন অভিযান চালাচ্ছে।
তবে সেই আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইরানের সমাজে এখনও স্পষ্ট। সতর্কবার্তা ও বিচ্ছিন্নভাবে আইন প্রয়োগের পরও বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে হিজাব আইন অমান্য করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে হেলমেট পরা কিন্তু হিজাব ছাড়া তরুণীদের মোটরবাইক চালানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও দলবদ্ধভাবেও নারীদের মোটরবাইক চালাতে দেখা যাচ্ছে।
একটি পোস্টে শিরাজের একদল নারী নিজেদের ‘শিরাজের মোটরবাইক গার্লস’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। ইসফাহানে প্রায় ২০ জন নারীর মোটরসাইকেল চালানোর একটি ভিডিওকে ‘ইসফাহানে সবচেয়ে বড় নারী মোটরসাইকেল আয়োজন’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে হিজাবকে অগ্রাধিকার দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। এক রক্ষণশীল আলেমের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন করেন, আইন করে কি সত্যিই মানুষের আচরণ পরিবর্তন করা যায়?
তিনি আরও বলেন, তার মেয়ের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তার মতপার্থক্য রয়েছে। তাহলে কি তাকে জোর করে নিজের মত মানাতে হবে—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
দেশটির সাবেক সংসদ সদস্য গোলামালি জাফরজাদেহ ইমানাবাদিও কর্মকর্তাদের হিজাবের পরিবর্তে মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ইরানের কট্টরপন্থীরা হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে চলেছেন। কেহান পত্রিকার সম্পাদক হোসেইন শরিয়তমাদারি বলেছেন, হিজাব আইন কার্যকর করা কর্মকর্তাদের জন্য একই সঙ্গে আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
এনএনবাংলা/

