আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল-ধর্মঘট অবৈধ: হাইকোর্ট

আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের হরতাল, ধর্মঘট কিংবা কর্মবিরতি আহ্বানকে অবৈধ ও সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আদালতের রায় বা আদেশের প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘট বা হরতাল ডাকা হলে সংশ্লিষ্ট বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনগত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সল হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সব নির্বাহী ও বিচারিক কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আদেশ পালন করতে বাধ্য। কোনও রায় বা আদেশে সংক্ষুব্ধ পক্ষের আপিল কিংবা আইনানুগ প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সেই রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল, ধর্মঘট বা কর্মবিরতি আহ্বান করা আইনসম্মত নয়।
হাইকোর্ট বলেন, আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মসূচি বিচার বিভাগের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। তাই আদালতের রায় বা আদেশের প্রতিবাদে কোনও ধরনের হরতাল কিংবা ধর্মঘট আহ্বান করা যাবে না।
রায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)-সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আদালতের রায় ও আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান করা হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যে ঘটনায় রিট
এর আগে ২০১১ সালের আগস্টে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় ‘ডিলাক্স পরিবহন’-এর একটি বাসের সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক ও সম্প্রচারক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বাসচালকের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাজা দেন। ওই সাজাকে কেন্দ্র করে বাস মালিকরা পরিবহন ধর্মঘট ও হরতাল আহ্বান করেন।
ঘটনাটি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে জনস্বার্থে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে রিট দায়ের করে।
রিটের শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ১ মার্চ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রুল জারি করেন। একইসঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্মঘট ও হরতাল প্রত্যাহার এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের ওই নির্দেশের পরদিন পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
পরে ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয় বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সল হাসান আরিফের বেঞ্চে। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রুলটি অ্যাবসোলিউট ঘোষণা করে এ রায় দেন।
রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে, ধর্মঘটের নয়
রিটকারী সংগঠন এইচআরপিবির পক্ষে শুনানিতে সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আদালতকে বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের রায় ও নির্দেশনা পালন করা সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক। দুর্ঘটনার ঘটনায় বাসচালকের সাজা হওয়ার পর মালিকরা পরিবহন ধর্মঘট ডেকে আদালতের আদেশের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, সংবিধান নাগরিকের চলাচলের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। কোনও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার আইনগত সুযোগ থাকলেও রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট বা হরতাল ডাকার সুযোগ নেই।
রিটের আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ছারওয়ার আহাদ চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল ইসলাম। এইচআরপিবির পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তাকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট সঞ্জয় মণ্ডল ও অ্যাডভোকেট রিপন বাড়ৈ।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আহসান হাবীব। বিআরটিসির পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট আসিবুল হক এবং বিআরটিএর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. রাফিউল ইসলাম।
মামলায় বিবাদী করা হয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিআরটিএ ও বিআরটিসির চেয়ারম্যান, ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি এবং সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিসহ মোট ১৭ জনকে।
এনএনবাংলা/
