সাম্প্রতিক
Skip to content

কক্সবাজারে ৩ বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ, মালিকরা বলছেন ‘বাবার উপহার’

ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের একটি পাঁচতারকা হোটেলের পার্কিং থেকে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গাড়িগুলোর বৈধ আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রাথমিকভাবে দেখাতে না পারায় সেগুলো জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের দাবি, এগুলো তাদের বাবার দেওয়া উপহার।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) কক্সবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ।

শুল্ক গোয়েন্দার তথ্য অনুযায়ী, ‘ইউজড কার পার্টস’ বা ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন অংশ আমদানি করে পরে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরি করার একটি কৌশল অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিএমডব্লিউ, টয়োটা রয়াল সালুন, ক্রাউন ও রেঞ্জ রোভারের মতো বিলাসবহুল গাড়ি তৈরি করে সড়কে চালানোর অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রেজভী আহম্মেদ বলেন, অভিনব কায়দায় বিভিন্ন গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানি করে সেগুলো দেশে সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপান্তর করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে তথ্যদাতা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হয়।

মোংলা বন্দরে চালান নিয়ে সন্দেহ

শুল্ক গোয়েন্দার এই কর্মকর্তা জানান, গত ২৭ আগস্ট মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে আনা কয়েকটি চালান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়। পরে চালানগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়, আমদানি করা যন্ত্রাংশগুলো একত্র করলে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরি করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক কাস্টমস বিধি অনুযায়ী কোনো পণ্যের ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বা মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রায় সব যন্ত্রাংশ একসঙ্গে আমদানি করে সেগুলো সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ পণ্য তৈরির সুযোগ থাকলে সেটিকে চূড়ান্ত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানান রেজভী আহম্মেদ।

তার ভাষ্য, এই বিষয়টিকে সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

চট্টগ্রামে বিএমডব্লিউ জব্দ

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের একটি আবাসিক এলাকার একটি ভবনের পার্কিং থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিএমডব্লিউ গাড়ি জব্দ করা হয়। গাড়িটির বৈধ আমদানি কিংবা ক্রয়ের কোনো নথি সংশ্লিষ্টরা দেখাতে পারেননি বলে জানান শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তা।

পরে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কক্সবাজারের একটি তারকা মানের হোটেলে থাকা কয়েকটি গাড়ির সন্ধান পায় শুল্ক গোয়েন্দা।

শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রাম থেকে একটি দল কক্সবাজারে গিয়ে হোটেলটির পার্কিংয়ে তিনটি গাড়ি দেখতে পায়। রেজভী আহম্মেদ বলেন, রাত প্রায় ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়িগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত হন।

জব্দ করা তিনটি গাড়িই জাপানি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তবে গাড়িগুলোর সঠিক মডেল, সিসি ও প্রকৃত মূল্য তদন্তের পর নির্ধারণ করা হবে।

ছবি: সংগৃহীত

দুটি গাড়িতে ছিল না নম্বর প্লেট

শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তা জানান, তিনটি গাড়ির মধ্যে দুটি গাড়িতে কোনো নম্বর প্লেট ছিল না। গাড়ির সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা দাবি করেন, এগুলো ‘রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াধীন’। তবে গাড়িতে ‘অ্যাপ্লাইড ফর রেজিস্ট্রেশন’ লেখা বা এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।

পরে সকালে আবার কাগজপত্র চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা সময়ক্ষেপণ করছিলেন বলে অভিযোগ করেন রেজভী আহম্মেদ। এরপর আইন অনুযায়ী ডিটেনশন মেমো ইস্যু করে গাড়িগুলো জব্দ করা হয়।

‘বাবার কাছ থেকে গিফট’

শুল্ক গোয়েন্দার জিজ্ঞাসাবাদে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা দাবি করেন, গাড়িগুলো তারা তাদের বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন। তবে এই দাবির সত্যতা নথিপত্র যাচাই করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন রেজভী আহম্মেদ।

প্রাথমিকভাবে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন—টয়োটা সেলুন ব্র্যান্ডের ঢাকা মেট্রো গ-৩০-১২৩৪ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ হাসিবুর রহমান সিনহা, হোন্ডা ব্র্যান্ডের ঢাকা মেট্রো গ-১৮-৯৬৩৮ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ সাফিয়াত মাহমুদ এবং জাপানের তৈরি মাজদা ব্র্যান্ডের ঢাকা মেট্রো গ-২৪-৭৩৫৯ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ সারাফাত রহমান ঈশান।

তাদের জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তা। তবে জব্দ করা গাড়িগুলোর প্রকৃত মালিক কে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলতে রাজি হননি তিনি।

গাড়িগুলোর দাম কত?

জব্দ করা গাড়িগুলোর আনুমানিক মূল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে রেজভী আহম্মেদ বলেন, গাড়ির মূল্য নির্ধারণে তারা বিশেষজ্ঞ নন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিএমডব্লিউ গাড়ির দাম ৮০ লাখ টাকা থেকে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আবার চার হাজার সিসির বেশি হলে শুল্কের স্ল্যাবও ভিন্ন হয়।

জাপানি গাড়ির মূল্য নির্ধারণে ‘ইয়েলো বুক’ অনুসরণ করা হয় বলেও জানান তিনি। প্রাথমিকভাবে জব্দ করা গাড়িগুলোকে স্পোর্টস কার ও বিলাসবহুল গাড়ি বলে মনে হচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীত

আমদানি থেকে অ্যাসেম্বলি—সবই তদন্তে

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর বলছে, এখন তাদের মূল লক্ষ্য হলো গাড়িগুলো কীভাবে দেশে এসেছে এবং কোথায় সংযোজন বা অ্যাসেম্বলি করা হয়েছে, তা বের করা।

রেজভী আহম্মেদ বলেন, গাড়িগুলোর আমদানি প্রক্রিয়া কী ছিল, কীভাবে দেশে এসেছে এবং কোথায় অ্যাসেম্বলি করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হবে।

আমদানি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর চোরাচালানের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সব আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এর পেছনে থাকা নেটওয়ার্কও শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি জানান, আমদানি অবৈধ প্রমাণিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ও তদন্তে আসতে পারে। একইভাবে গাড়ির ব্র্যান্ড নকলের প্রমাণ পাওয়া গেলে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।

তবে গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের পেশা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুল্ক গোয়েন্দার তদন্তের বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন রেজভী আহম্মেদ।

গাড়ি জব্দের অভিযানে র‍্যাব, কক্সবাজার জেলা পুলিশ এবং বিভিন্ন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সহযোগিতা করেছে বলে জানান তিনি। অভিযানের পুরো প্রক্রিয়ার সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বিষয়টি সরাসরি তদারক করছেন এবং শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালকের মাধ্যমে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

জব্দ করা গাড়িগুলো শুল্ক গোয়েন্দার হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

রেজভী আহম্মেদ বলেন, গাড়িগুলোর বৈধতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে। তবে চোরাচালানের আলামত স্পষ্ট হলে প্রযোজ্য সব আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনায় কোনো বিদেশি নাগরিক জড়িত কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির উপপরিচালক প্রণয় চাকমা।

এনএনবাংলা/