Skip to content

গ্যাসের অভাবে ধুঁকছে শিল্পখাত, রপ্তানি আদেশ ও কর্মসংস্থান নিয়ে শঙ্কা

ফটো কোলাজ: নিউ নেশন

দেশে চলমান গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের অভাবে উৎপাদনমুখী শিল্পখাত গভীর সংকটে পড়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে অনেক শিল্প-কারখানাকে বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়ছে চাপ।

একই সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট দেশের পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোতে ঘন ঘন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

উৎপাদন বিলম্বিত হওয়ায় সময়মতো রপ্তানি চালান পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারানো, ক্রয়াদেশ বাতিল এবং ভবিষ্যতে নতুন রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শিল্প মালিকদের মতে, দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের উৎপাদন, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।

বড় সংকটে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি ও মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন সচল রাখতে কারখানাগুলোকে দীর্ঘ সময় ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি জানান, গাজীপুরের কারখানায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা এবং নারায়ণগঞ্জের কারখানায় প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ডিজেল দিয়ে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তার মতে, দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা এবং কর্মসংস্থান রক্ষা—সবই বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কতটা কমেছে তার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও অনেক কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কমে গেছে।

তিনি বলেন, চলমান গ্যাস সংকট অনেক কারখানার জন্য সাময়িকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। পর্যাপ্ত গ্যাস ছাড়া কারখানা পরিচালনা যেমন কঠিন হয়ে পড়েছে, তেমনি বিকল্প জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয় বহন করাও অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

মাহমুদ হাসান খান বাবুর ভাষ্য, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অনেক উদ্যোক্তাকে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো সম্ভব না হলেও শ্রমিকদের পুরো বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করায় উৎপাদন ব্যয় কার্যত দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

শুধু তৈরি পোশাক শিল্প নয়, গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের প্রায় সব উৎপাদনমুখী শিল্পখাতেই। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে স্থানীয় বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে উৎপাদন, পণ্য সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভোক্তাপণ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বাজারে পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সমাধান করবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

তার মতে, এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোক্তাপণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, যার প্রভাব সরাসরি পণ্যের দামে পড়বে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

যে কারণে গ্যাস সংকট

মহেশখালী উপকূলে স্থাপিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি পুনঃগ্যাসীকৃত এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ কমে গেছে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি খাতে বড় ধরনের গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে।

তবে এফএসআরইউটির মেরামত কাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে টার্মিনালটি পুনরায় চালু হয়ে জাতীয় গ্রিডে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ শুরু না হওয়া পর্যন্ত চলমান সংকট অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানা গেছে।

এনএনবাংলা/