Skip to content

হামের চিকিৎসায় ঋণগ্রস্ত ৮৯% পরিবার, সঞ্চয় শেষ ৬১ শতাংশের: জরিপ

ছবি: সংগৃহীত

দেশে হামের প্রকোপের মধ্যে সন্তান হারানোর বেদনার পাশাপাশি আক্রান্ত পরিবারগুলোর ওপর চিকিৎসা ব্যয়ের যে ভয়াবহ আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, তার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে এক মূল্যায়ন জরিপে। জরিপে দেখা গেছে, হামের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রায় ৮৯ শতাংশ পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ছয়টি, অর্থাৎ ৬১ শতাংশ পরিবার নিজেদের জমানো সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) যৌথভাবে পরিচালিত এই জরিপের ফলাফল সোমবার (৩ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হামের প্রাদুর্ভাবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে।

জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৭৫ শতাংশ রোগীর বয়স ৪ বছরের নিচে। এছাড়া ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোগী ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সী রোগী ৬ শতাংশ।

জরিপ অনুযায়ী, চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে প্রতিটি পরিবার গড়ে ১৬ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। এই ব্যয় মেটাতে গিয়ে ৪ শতাংশ পরিবার নিজেদের সম্পদ বিক্রি করেছে এবং প্রায় ৩ শতাংশ পরিবার অনুদানের ওপর নির্ভর করেছে।

জরিপে অংশ নেওয়া সব পরিবারই জানিয়েছে, সংকট কাটিয়ে উঠতে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার সবচেয়ে জরুরি সহায়তা হিসেবে ওষুধের কথা বলেছে। এরপর রয়েছে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তা, যা চেয়েছে ৩৩ শতাংশ পরিবার। খাদ্য সহায়তাকে সবচেয়ে জরুরি বলে উল্লেখ করেছে ২২ শতাংশ পরিবার।

পেশাগত তথ্য দেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। তাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের সদস্যের পাশে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে গিয়ে অনেকেই আয় হারিয়েছেন, এমনকি চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।

জরিপে রংপুরের হাজেরা খাতুনের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। গত জুন মাসে ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসেন। মেয়ের চিকিৎসায় ইতোমধ্যে তাদের ৭০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।

হাজেরা খাতুন বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও এর বাইরে অনেক খরচ রয়েছে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিদিনের খাবার, বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে। তার স্বামী সৌদি আরবে কর্মরত থাকলেও চলতি মাসে বেতন না পাওয়ায় পরিবারের আর্থিক সংকট আরও বেড়েছে।

জরিপের ভিত্তিতে নির্ধারিত ঝুঁকির মানদণ্ড অনুযায়ী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪০০টি পরিবারকে জরুরি নগদ সহায়তা হিসেবে প্রতি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল কবির এম আশরাফ আলম বলেন, এই মূল্যায়নে স্পষ্ট হয়েছে যে, ‘অনেক পরিবার শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, একই সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। জরুরি সাড়ার অংশ হিসেবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং পাশাপাশি কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।’

বাংলাদেশে আইএফআরসি-এর হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, ‘হামের স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার প্রভাব হাসপাতালের বাইরেও বিস্তৃত। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের সদস্যের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক পরিবার কঠিন আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। এই মূল্যায়নের ফলাফল দেখাচ্ছে, জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষাও সমানভাবে প্রয়োজন। তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপই এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর।’

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, আইএফআরসি ও অন্যান্য অংশীজনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের দেশব্যাপী হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। পাশাপাশি কমিউনিটিতে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কেন্দ্রে সহায়তা এবং মানুষকে টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করতে এক হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।

এনএনবাংলা/