প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন দিকে?

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যা কিংবা ভৈরবে রাজনৈতিক নেতাকে কুপিয়ে হত্যার মতো ঘটনা কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি দেশে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড এখন ক্রমেই দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে? পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে সারা দেশে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৯৩৪টি। অর্থাৎ প্রতি মাসে ৩০০টির বেশি এবং প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
শুধু তিন মাসের হিসাবেই নয়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। এ সময়ে সারা দেশে মোট ২ হাজার ৭৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি, মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি, মে মাসে ৩১০টি, জুনে ৩২৬টি এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে।
সরকারের ছয় মাসেও কমেনি খুন
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। আগের ছয় মাসের তুলনায় বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে হত্যার মামলা বরং ৯টি বেড়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।
চুরি ও ডাকাতির ঘটনা কিছুটা কমলেও হত্যাকাণ্ডের এই চিত্র মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। প্রশ্ন উঠছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ কতটা সফল হচ্ছে?
হত্যাকাণ্ড বাড়ার পেছনে যে কারণগুলো
অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বড় একটি অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক উমর ফারুকের মতে, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার সংঘাতকে দ্রুত প্রাণঘাতী করে তুলছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক কোন্দল: ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাতও হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সাত মাসে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৭৭ জন নিহত হয়েছেন।
বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার সংঘর্ষের পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও নিহত হয়েছেন ১৬ জন।
মব সহিংসতা: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দৃশ্যমান হওয়া ‘মব কালচার’ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত সাত মাসে মব সহিংসতায় ১ হাজার ৩২৪ জনের প্রাণ গেছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকায় ৫০ জন এবং চট্টগ্রামে ৩১ জন নিহত হয়েছেন।
এর বাইরে জমি নিয়ে বিরোধ, মাদক, পারিবারিক কলহসহ নানা সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধও হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখছে।
পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়েছিল। এখনো অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ভীতি ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য, মানুষের মধ্যকার স্থানীয় বিরোধ কিংবা হঠাৎ সংঘটিত অপরাধ আগে থেকে অনুমান করা বা প্রতিরোধ করা কঠিন। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্রে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান মনে করেন, এটি একটি নির্বাচিত সরকার; ফলে রাজনৈতিক সংঘাত বা পদ-পদবি নিয়ে সহিংসতার দায় সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না। পুলিশের যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ থাকে, তাহলে বিশেষ অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না কেন—এ প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
দ্রুত বিচার না হলে ভয় কমবে না
মিরপুরের শিশু রামিসা হত্যার বিচার মাত্র ১৯ দিনে সম্পন্ন হলেও হাজার হাজার মামলায় এমন দ্রুত বিচার দেখা যায় না। দীর্ঘসূত্রতা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব অপরাধীদের মধ্যে অপরাধ করার ভয় কমিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে শুধু মামলা ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়; দ্রুত তদন্ত, বিচার এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।
কীভাবে কাটবে সংকট?
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে প্রথমেই দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
সবশেষে অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে দ্রুততম সময়ে বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে প্রতিদিনের হত্যাকাণ্ডের এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা হয়ে থাকবে না; বরং তা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার গভীর সংকেত হয়ে উঠবে।
এনএনবাংলা/

