ঢাকায় নারী চালিত ‘পিংক বাস’– কেন ইলেকট্রিক বাসই হতো ভালো পছন্দ

ঢাকায় নারী চালক দিয়ে পরিচালিত ‘পিংক বাস’ চালু করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য নারী যাত্রীদের জন্য নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আরামদায়ক গণপরিবহন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিন ধরে পুরুষপ্রধান এই খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। উদ্যোগটি ইতিবাচক ও প্রগতিশীল হলেও বাস্তবে বেশ কিছু সমস্যা ইতোমধ্যে সামনে এসেছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এই পিংক বাসগুলো আধুনিক নয়। এগুলো মূলত পুরনো অশোক লেল্যান্ড (Ashok Leyland Titan) দ্বিতল বাস, যেগুলো আগে থেকেই বিআরটিসির ফ্লিটে ছিল। এসব বাসের ইঞ্জিন ৫৬৬০ সিসির এইচ-সিরিজ ৬ সিলিন্ডার টার্বোচার্জড ডিজেল ইঞ্জিন, যার পাওয়ার প্রায় ১৬০ বিএইচপি এবং টর্ক ৫৫০ নিউটন-মিটার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এগুলোতে ম্যানুয়াল ট্রান্সমিশন (৫ স্পিড গিয়ারবক্স) ব্যবহার করা হয়েছে।
ঢাকার বিশৃঙ্খল যান চলাচল, চালকদের বেপরোয়া আচরণের মধ্যে এ ধরনের ম্যানুয়াল বাস চালানো অত্যন্ত কঠিন, শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। ঘন ঘন গিয়ার চেঞ্জ, হঠাৎ ব্রেক ও স্টপের কারণে চালকদের ওপর চাপ পড়ে। বিশেষ করে যারা এই পেশায় নতুন, তাদের জন্য এটি আরও কঠিন।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে শুরু থেকেই অটোমেটিক ট্রান্সমিশন ও আধুনিক হাই-টেক বাস ব্যবহার করা উচিত ছিল। ইলেকট্রিক বাস হলে আরও ভালো হতো। বৈদ্যুতিক গাড়িতে কোনো প্রকার জ্বালানি শক্তির ব্যবহার না হওয়ায় গাড়ি থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয় না। ফলে পরিবেশ রক্ষায় এই গাড়িগুলো ভূমিকা রাখে। আর তাই পরিবেশ দূষণ রোধ এই গাড়িগুলো তুলনাহীন।
এছাড়া শব্দ কম করে, চালাতে শারীরিক পরিশ্রম কম লাগে এবং শহরের ট্রাফিকের জন্য অনেক বেশি উপযোগী। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের করাচিতে এবং ভারতের কেরালা ও পাটনায় নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আরও উন্নত ও যাত্রীবান্ধব বাস ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশও সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরনো ‘লক্কড়ঝক্কড়’ ম্যানুয়াল অশোক লেল্যান্ড বাস রঙ করে না দিয়ে আধুনিক অটোমেটিক বা ইলেকট্রিক বাস দিয়ে শুরু করতে পারত।
যদিও বাসগুলো নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে, ঢাকার সড়কে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য বেশি সিসিটিভি, জরুরি সংকটকালীন সময়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা ও প্রশিক্ষিত কর্মীর অপ্রতুলতা— নারী চালক ও যাত্রী উভয়েই ঝুঁকির মধ্যে আছেন। পিংক বাসের সংখ্যা এখনো খুবই কম, ফলে যাতাযতের জন্য নারীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে কর্মক্ষেত্র ও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে তুলনামূলক সময় বেশি নষ্ট হওয়ার কারণে অনেক নারী সুবিধার জন্য সাধারণ বাস বা অন্যান্য পরিবহনই বেছে নিচ্ছেন।
ঢাকার অগোছালো ট্রাফিকে বড় বাস চালানোর জন্য প্রয়োজন দক্ষতা সম্পন্ন চালক। নতুন নিয়োগ পাওয়া অনেক নারী চালকের ভারী যানবাহন, বিশেষ করে ম্যানুয়াল বাস চালানোর অভিজ্ঞতা সীমিত। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রতিনিয়ত তাদেরকে সহায়তা করে যেতে হবে, না হলে বাড়বে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। কিছু পুরুষ যাত্রী ও চালক এখনো নারী চালিত বা নারী-কেন্দ্রিক বাসের ধারণাকে মেনে নিতে পারছেন না। এই সামাজিক বাধা কাটাতে সময় ও সচেতনতামূলক প্রচারও দরকার আছে।
ঢাকায় নারী চালিত ‘পিংক বাস’চালু হওয়া ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে পুরনো মডেলের ম্যানুয়াল অশোক লেল্যান্ড বাস দিয়ে শুরু করায় উদ্যোগটির কার্যকারিতা অনেক কমে গেছে। এই প্রকল্প সফল করতে হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আধুনিক অটোমেটিক ও ইলেকট্রিক বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে, রুট সম্প্রসারণ করতে হবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে এবং নারী চালকদের আরও ভালো প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তা না হলে একটি ভালো ধারণা শুধু প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
এনএনবাংলা/

