সাম্প্রতিক
Skip to content

মানবসম্পদ উন্নয়নে চীনের শিক্ষা মডেল বাংলাদেশকে বদলে দিতে পারে

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করে এসে ৩০ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে চীনের মডেল বাংলাদেশে অনুসরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তার এই বক্তব্য প্রকাশিত হবার পর মোঃ সাহাবুল হক , যিনি শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ সম্পর্কে একটি দৈনিকে তার মতামত দিতে গিয়ে গত ১২ সেপ্টেম্বর লেখেন, ‘‘দেশে হাজার হাজার কারিগরি প্রতিষ্ঠান থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, আধুনিক ল্যাবরেটরি নেই, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগও নেই, অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীও নেই। এত দুর্বল একটি ভিত্তির উপর বিদেশি কোন মডেল বাস্তবায়ন করলে তা আদৌ কতটা কার্যকর হবে?’

তার এই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করার যৌক্তিকতা থাকতে পারে। তার কথার জবাব কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দিতে পারেন। আমি সে জবাব দিতে যাবো না। আমি কেবল আমার শিক্ষা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দু-একটি কথা বলতে চেষ্টা করবো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্নে আমি যখন উত্তর বঙ্গের শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র তখন আমাদের উপাচার্য ছিলেন প্রফেসর ড. খান সারওয়ার মোর্শেদ, ইংরেজি সাহিত্যের উপর যার দখল ছিল ঈর্ষনীয় । আমরা যারা ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্বে ছিলাম তাদের সঙ্গে তিনি চমৎকার সম্পর্ক রক্ষা করতেন। অনেক বিষয় নিয়ে তার বাসায় আমরা আলোচনা করতাম। তার বুদ্ধিবৃত্তির উচ্চতা আমাকে মুগ্ধ করতো। তার সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করতাম। যাক সেকথা এবার আসল কথায় ফিরে আসি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে গঠন করা হয় জাতীয় শিক্ষা কমিশন । ২০ সদস্য নিয়ে গঠিত এই শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ডক্টর মুহম্মদ কুদরাত ই খুদা। পাকিস্তানের শেষ শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর ,যার প্রধান ছিলেন এয়ার মার্শাল নূর খান । তার নেতৃত্বে শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন জাতীয় মজুরি কমিশনও গঠন করা হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও বিজ্ঞান মনস্ক মানুষ ছিলেন। তবে তার শিক্ষা চিন্তা সম্পর্কে ইংরেজি সাহিত্যের আর একজন পন্ডিত প্রফেসর ড.সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন তার স্মৃতিচারণে নূর খান সম্পর্কে অনেক বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তিনি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। কিন্তু তিনি শিল্প শ্রমিকদের জন্য জাতীয় সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন তার প্রশংসা আমি শুনেছি খুলনার শ্রমিক নেতা ডা. এস দাহার ও জাতীয় লীগের আশরাফ আলীর কাছে। আমি তখন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক হিসেবে দক্ষিণ বাংলায় ছাত্রদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম। কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে তা বাস্তবায়ন করার সুযোগ ছিল না। আর সেই যুদ্ধ শেষে আমাদের শিল্প ও শিল্প শ্রমিকের জীবন জীবিকা কিভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল সে দৃশ্য নতুন প্রজন্মের দেখার কথা নয়। কিন্তু যারা বয়স্ক তাদের তো অনেক কিছু জানা আছে।

যুদ্ধোত্তর শিক্ষাঙ্গনের অবস্থাও ছিল সঙ্গীন। শিক্ষার পুনর্গঠন ছিল জরুরি। শিক্ষক যারা ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই দেশ ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও অনেকে আর ফিরে আসেননি। অনেকে শহীদ হন। স্কুল কলেজের লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি অনেক কিছু ধ্বংস হয়ে যায়। অবকাঠামো পুনর্গঠনের আগেই শিক্ষার সেক্যুলার রূপ দিতে নতুন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় । কমিশনের চেয়ারম্যানের নাম আগেই উল্লেখ করেছি। কমিশনের সদস্য হিসেবে ছিলেন বুয়েটের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর এম,এ, রশীদ, ডক্টর এম, ইন্নাস আলী, ডক্টর এম, সামসুল হক, প্রফেসর আবদুল কাদির, প্রফেসর এ,এন,এম মাহমুদ প্রমুখ। সদস্যদের মধ্যে প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি এডুকেশনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদেরও প্রতিনিধি রাখা হয়েছিল।

জাতীয় শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও বিজ্ঞ সদস্যরা ছাত্র শিক্ষকদের মতামত যাচাই করার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেন। এমনকি একটি সফর করতে আসেন উত্তর বঙ্গের শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সঠিক তারিখটি মনে নেই তবে সফরটি হয়েছিল ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে অথবা ১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর খান সারোয়ার মুর্শিদ তার অফিস কক্ষে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে রাকসু ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। সেই মতবিনিময় সভায় ছাত্র নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নুরুল ইসলাম ঠান্ডু, মো.শামসুল হক টুকু, সুব্রত চৌধুরী, রেজাউল করিম, ফজলুর রহমান পটল ও সৈয়দ তোশারফ আলী। ফজলুর রহমান পটল ও রেজাউল করিম বেঁচে নেই।

এই মতবিনিময় সভায় উপাচার্য মহোদয় জাতীয় শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ডঃ কুদরাত ই খোদা সহ তার সফর সঙ্গী সদস্যদেরকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং সেই সঙ্গে তাদের কাছে আমাদের সম্পর্কেও একটা ধারণা দেন। তিনি কমিশনের চেয়ারম্যান ও কতিপয় সদস্যের আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সামান্য আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, রিপোর্ট চূড়ান্ত করার আগে ছাত্রদের যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের মতামত জানার জন্য এই উদ্যোগ। এরপর শুরু হয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট সম্পর্কিত আলোচনা। চেয়ারম্যান সাবেক জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করার লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন । তিনি বলেন, আমরা আজ শুনবো। উপস্থিত সবাই তাদের মতামত তুলে ধরেন। আলোচনায় উচ্চ শিক্ষার পাঠ্য বিষয়, সময় সীমা, অনার্সসহ মাস্টার্স কোর্স শেষ করতে কতটা সময় দিতে হবে, কত মার্কের পরীক্ষা হবে ল্যাঙ্গুয়েজ পেপার অনার্সে রাখা হবে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়। এক পর্যায়ে উপাচার্য মহোদয় আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন আপনি তো কিছু বলছেন না। আমি বললাম স্যার, আপনারা যখন বিদ্যায়তনী শিক্ষার বিভিন্ন পর্বের সময়কাল, ফলাফল নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবছেন তখন আমি ভাবছি অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে জব মার্কেটে গেলে যখন নিয়োগ কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা চাইবে ,তখন আমারা অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট কোথায় পাব? দক্ষতা অর্জন আর ডিগ্রি অর্জনতো এক কথা নয়। উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বেকার থাকার এই শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক রূপান্তর আনার কথা কি আমরা ভাবতে পারি না? শিক্ষার একটা ধাপ শেষ করার পর বাস্তব কোনো কাজ করা এবং কাজের প্রয়োজনে উচ্চতর ধাপের শিক্ষা গ্রহণ অপরিহার্য হলে তার ব্যবস্থা করা হলে কি ভালো ফল পাওয়া যাবে না? আমরা কি পূর্ব দিগন্তে চীনের পরীক্ষা নিরীক্ষা একটু মূল্যায়ন করে দেখতে পারি না?

আলোচনার ধরণ বদলে গেল। অনেক কিছু বলাবলি হলো। উপাচার্য স্যার বললেন, প্রবীনের চিন্তার সঙ্গে নবীনের চিন্তা মিলবে না। চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা আমূল বদলে ফেলা হয়েছে। তোমার কথায় তার ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু আমরা তো আমূল পরিবর্তন করার পথে হাঁটছি না। অতএব চিন্তার বৈপরীত্য মেনে নিয়েই আমাদের এই মতবিনিময় সভা এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। আমার বাসভবনে অতিথিদের জন্য মধ্যাহৃ ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। আপনারা সবাই আমন্ত্রিত।

এরপর আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে নেমে ডঃ শহীদ শামসুজ্জোহার মাজার রেখে ইউক্লিপটাস গাছের ছায়ায় ঢাকা পীচ ঢালা পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম উপাচার্যের বাসভবনে। গুণীজনদের সঙ্গে সেদিনের হাঁটার স্মৃতি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেদিন হলরুমে ঢুকে দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু পরিচিত শিক্ষক যথাসময়ে ভোজ সভায় উপস্থিত হয়েছেন। চমৎকার আয়োজনে ফুটে উঠেছে আভিজাত্যের সুস্পষ্ট ছাপ। রাজশাহীর অনন্য স্বাদের কৈ মাছ ও রুই মাছ ভাজির ডিস সাজানো। পোলাও, রোস্ট, খাসির রেজালা। দৈ, মিষ্টি সব মিলিয়ে এলাহি আয়োজন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক স্মৃতি মলিন হয়ে গেছে কিন্তু সেদিনের লাঞ্চের স্মৃতি আর বিভিন্ন পদের স্বাদ আজও অম্লান।

আজ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সেই স্মৃতি স্মরণ করা হতো না যদি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহাসুনুল হক মিলন শিক্ষা ব্যবস্থায় চীনা মডেলের প্রয়োগ করার আগ্রহ প্রকাশ করতেন । আমার ধারণা এটাই সত্যিকার মানব সম্পদ উন্নয়নের পরীক্ষিত সুলভ পথ। এই পথে হেঁটেই চীন আজ আমেরিকার সমকক্ষ হতে চলেছে। স্বাধীনতার পর এই পথ বেছে নিলে আজ আমারাও বিশ্বমঞ্চে সম্মানজনক আসন পেতাম। এখনও পরীক্ষামূলক ভাবে দু-একটি এলাকায় করে দেখুন। কথায় বলে বৃক্ষ তোমার নাম কি ? ফলে পরিচয়। অথবা চীনা নেতা যেযন বলেছেন বিড়াল সাদা না কালো সেটা বড় কথা নয়, দেখতে হবে সে ইঁদুর ধরতে পারে কিনা?

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দি নিউ নেশন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক।