বিশ্ব এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে: সংঘাত বাড়ছে, শান্তির সন্ধান ব্যাহত
বিশ্ব আজ এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত সামরিক সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জনঅসন্তোষ সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শান্তি রক্ষার সক্ষমতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। একসময় ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হওয়া সংঘাতগুলো এখন জ্বালানি বাজার, কৌশলগত জোট, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, সামরিক সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পথ এখনো বাধাগ্রস্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের নেতারা এসব সংকটকে পরস্পরের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠা থেকে বিরত রাখতে পারবেন কি না এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশকে আরও অস্থিরতার দিকে এগিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারবেন কি না।
সৌদি আরব: সামরিক প্রতিরোধের সীমাবদ্ধতা
আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি সৌদি আরব ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে হুথিরা রিয়াদকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করে। এসব হামলার মধ্যে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সৌদি আরামকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আঘাতের ঘটনাও রয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো সুরক্ষিত রাখার সৌদি সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সৌদি আরবের হাতে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম ও বিপুল আর্থিক সম্পদ রয়েছে। তবু এসব সুবিধা অসম যুদ্ধকৌশলে অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষের হুমকি দূর করতে পারেনি। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, বিচ্ছিন্ন সামরিক নেটওয়ার্ক এবং ইয়েমেনের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা বা পাল্টা হামলার মাধ্যমে এ সংঘাতের সমাধান কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই সংকটের সঙ্গে ইরান এবং তার আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বৃহত্তর বিরোধও জড়িত। তবে প্রতিটি হুথি হামলার সিদ্ধান্তের ওপর ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে—এমন দাবি প্রমাণ ছাড়া করা উচিত নয়।
সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। তিন দেশ ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ৫ অক্টোবর তারা চুক্তির সম্মিলিত প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সম্মত সামরিক সক্ষমতা দ্রুত সৌদি আরবে মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণে একমত হয়।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, চুক্তিটিকে কার্যকর করার উদ্যোগ চলছে। তাই এই জোট ইতিমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অকালপক্ব হবে। তবে হুথিদের অব্যাহত হামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেছে: সামরিক জোট গঠন করা আর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা-হুমকি নির্মূল করা এক বিষয় নয়।
চুক্তিটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয়, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর। পরিশেষে, সৌদি আরবের একটি কার্যকর রাজনৈতিক কৌশলও প্রয়োজন। ইয়েমেনের সংঘাতের অবসান এবং আঞ্চলিক বৈরিতা হ্রাসে আলোচনা দীর্ঘমেয়াদে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের অন্তহীন চক্রের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
ইউরোপ: যে যুদ্ধের শেষ দেখা যাচ্ছে না
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউরোপকে এ যুদ্ধের পরিণতি বহন করতে হচ্ছে। সংঘাতটি ইউরোপের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে এবং মহাদেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে এবং উভয় পক্ষই হামলা জোরদার করেছে। ১৭ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের কথা উঠে আসে। এতে কিয়েভের প্রতি মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপের জন্য এ যুদ্ধের প্রভাব শুধু রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারগুলোকে প্রতিরক্ষা চাহিদার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো সুরক্ষা এবং রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এখনো বড় প্রশ্ন।
রাশিয়ার কৌশলগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা কিংবা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্প—কোনোটিই এখনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। টেকসই শান্তির জন্য ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্ন সমাধানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন করে আগ্রাসন ঠেকানোর বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আলোচনার নামে আগ্রাসনের শিকার দেশের অধিকার ও নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা যায় না। আবার যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়াকেও কূটনীতির গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মূল চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করা, যা নতুন যুদ্ধের সম্ভাবনা পিছিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান: উত্তেজনা থেকে প্রকাশ্য যুদ্ধ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য অন্যতম গুরুতর হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এটি এখন আর শুধু বৈরী বক্তব্য, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা নয়।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং সামুদ্রিক চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অক্টোবরেও কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল, কিন্তু বিরোধের মৌলিক বিষয়গুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। সরু এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। জাহাজ চলাচলে বাধা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর হুমকি জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এর পরিণতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসম্পন্ন উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের উপলব্ধি করা দরকার যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির মূল্য শুধু রণক্ষেত্রেই দিতে হয় না। পারমাণবিক কূটনীতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া সামরিক পদক্ষেপ আরও পাল্টা হামলার জন্ম দিতে পারে, অথচ বিরোধের মূল কারণগুলো অমীমাংসিতই থেকে যেতে পারে।
গাজা: যুদ্ধবিরতি মানেই শান্তি নয়
কূটনৈতিক অঙ্গীকারকে স্থায়ী নিরাপত্তায় রূপান্তর করতে না পারার আরেকটি বেদনাদায়ক দৃষ্টান্ত গাজা।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও সহিংসতা ও বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।
২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর জাতিসংঘ জানায়, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজায় ১,৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত সংঘাত-সম্পর্কিত ১,০৭৬টি মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করেছিলেন। এই দুটি পরিসংখ্যানের সময়সীমা ও যাচাইয়ের মানদণ্ড আলাদা। তাই এগুলোকে একই ধরনের তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
অব্যাহত প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামোর ধ্বংস এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার প্রতিবন্ধকতা মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা প্রকাশ করে।
ইসরায়েলের বৈধ নিরাপত্তা-উদ্বেগ রয়েছে, বিশেষ করে দেশটির বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি মোকাবিলার প্রশ্নে। কিন্তু অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে অনির্দিষ্টকাল দুর্ভোগের মধ্যে রেখে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা অপরিহার্য দায়িত্ব।
একইভাবে, ফিলিস্তিনিদের একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রয়োজন। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে রাখা যায় না। আন্তর্জাতিক উদ্যোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত অব্যাহত মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন, জবাবদিহি এবং কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের পথে অর্থবহ আলোচনা।
এসব উদ্যোগ ছাড়া যুদ্ধবিরতি সহিংসতার পরবর্তী পর্বের মধ্যবর্তী একটি সাময়িক বিরতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
দক্ষিণ এশিয়া: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা
দক্ষিণ এশিয়ার সামনে ভিন্ন ধরনের হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাকিস্তান ও ভারতের রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখিয়ে দিচ্ছে, জনআস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা এবং ভিন্নমত মোকাবিলার পদ্ধতি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
পাকিস্তানে সরকার, কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক এবং প্রাদেশিক রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ অস্থিরতা বাড়িয়েছে। অক্টোবর মাসে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করার ঘটনা নিরাপত্তা-উদ্বেগ ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মধ্যকার টানাপোড়েন প্রকাশ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা-হুমকি ও জঙ্গিবাদকে তাদের পদক্ষেপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক শাসনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
ভারতেও নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে বিক্ষোভ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। রয়টার্সের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনী ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ এসব আন্দোলনের অন্যতম বিষয়, যদিও নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে।
এসব ঘটনাকে ভারত বা পাকিস্তানের আসন্ন রাজনৈতিক পতনের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও পরিস্থিতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তবে উভয় দেশের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার এবং জবাবদিহি অপরিহার্য।
ঐতিহাসিক সংঘাত এবং দুই দেশের পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও আঞ্চলিক গুরুত্ব রয়েছে। দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিক সংলাপ অভ্যন্তরীণ উত্তেজনাকে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বিরোধ আরও বাড়িয়ে তোলা থেকে বিরত রাখতে পারে।
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ: শক্তিকে দায়িত্বে রূপান্তর
সব সংকট একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি উদ্বেগজনক বৈপরীত্য সামনে আসে। রাষ্ট্রগুলো সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করছে, নতুন জোট গঠন করছে এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নামছে। অথচ লাখ লাখ মানুষ যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা, বাস্তুচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সামরিক প্রস্তুতি নিজে থেকেই অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। জনগণের সুরক্ষা ও দেশের ভূখণ্ড রক্ষা করা প্রতিটি সরকারের দায়িত্ব। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সামরিক শক্তি নীতিনির্ধারণের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয় এবং কূটনীতিকে গৌণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো এবং মানবিক নীতি রক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর হতে হবে। বৃহৎ শক্তিগুলোর উচিত কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য আঞ্চলিক সংঘাতকে ব্যবহার না করে সংযম প্রদর্শন করা। আঞ্চলিক সংস্থা ও মধ্যম শক্তিগুলোরও উচিত প্রতিদ্বন্দ্বী জোটকে আরও শক্তিশালী করার পরিবর্তে আলোচনা ও পারস্পরিক আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখা।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপদ সামুদ্রিক বাণিজ্য, মানবিক সহায়তা এবং নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক যোগাযোগ সংঘাতের প্রণোদনা কমাতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার জন্য ইয়েমেন, ইরান, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের পরস্পরসংযুক্ত সংকটগুলোর অগ্রগতি জরুরি। ইউরোপে যেকোনো সমঝোতায় ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং নতুন করে আগ্রাসন প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও সংলাপ অপরিহার্য।
উপসংহার: বিশ্বের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
বিশ্বে সামরিক শক্তি, আর্থিক সম্পদ কিংবা কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। অভাব রয়েছে সংঘাতের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য আরও বেড়ে যাওয়ার আগেই সেগুলো সমাধানের কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছার।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা-সংকট, ইউরোপের চলমান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত, গাজার মানবিক বিপর্যয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা একেকটি স্বতন্ত্র সংকট। তবু সবগুলোই একটি অভিন্ন সতর্কবার্তা দিচ্ছে: শক্তি পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে, কিন্তু শুধু শক্তি দিয়ে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
বিশ্বনেতাদের সামনে মৌলিকভাবে দুটি পথ রয়েছে। তাঁরা সংঘাত, প্রতিশোধ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের ওপর নির্ভর করে এগিয়ে যেতে পারেন, অথবা উপলব্ধি করতে পারেন যে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার ভিত্তি হলো আলোচনা, ন্যায়বিচার, সংযম এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
শান্তি দুর্বলতার লক্ষণ নয়, কূটনীতিও দায়িত্ব এড়ানোর পথ নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস, কৌশলগত ধৈর্য এবং মৌলিক নীতির প্রশ্নে আপস না করেও অন্যের বৈধ উদ্বেগ উপলব্ধি করার মানসিকতা।
পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এই বিশ্বে কোনো দেশই দূরবর্তী সংঘাতের পরিণতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, বাণিজ্যে বাধা এবং নিরাপত্তাহীনতা ভৌগোলিক সীমানা মেনে চলে না।
ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কোন দেশের সামরিক শক্তি সবচেয়ে বেশি তার ওপর নয়; বরং কোন দেশের নেতারা নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতে এবং আরও স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তার ওপরও।
জরুরি কাজটি শুধু একের পর এক সংকট সামাল দেওয়া নয়; বরং যেসব পরিস্থিতি এসব সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে, সেগুলোর মূল কারণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দি নিউ নেশন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক।
