ব্রিকসের উত্থান: বদলে যাচ্ছে বিশ্বব্যবস্থা, বাংলাদেশের সামনে নতুন সমীকরণ
ব্রিকস সম্মেলন শেষ হয়েছে। সম্মেলনে গৃহীত বিভিন্ন প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে সদস্য দেশগুলো যে বার্তা দিতে চেয়েছে, তা হলো—বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামো ক্রমশ বহুমুখী হয়ে উঠছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, গৃহীত প্রস্তাবগুলোর কতটা বাস্তবে কার্যকর হবে? ব্রিকসের এই উদ্যোগ বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে? যারা ব্রিকসের বাইরে রয়েছে, তাদের ওপরই বা এর কী প্রভাব পড়বে? বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আধিপত্য কি এতে কোনোভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে? বাংলাদেশের জন্যই বা এর তাৎপর্য কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ব্রিকসকে শুধু একটি অর্থনৈতিক জোট হিসেবে দেখলে চলবে না। এর ক্রমবর্ধমান সদস্যসংখ্যা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে এটি এখন বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা
ব্রিকসের আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং আর্থিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে অতিরিক্ত ডলারনির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
তবে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করা এবং তা বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক স্বার্থ ও বৈদেশিক নীতিতে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। চীন ও ভারতের মধ্যে যেমন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আছে, তেমনি ভূরাজনৈতিক মতপার্থক্যও রয়েছে। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে নিজস্ব বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহী। অন্য সদস্যদেরও রয়েছে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকার।
ফলে ব্রিকসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—বিভিন্ন জাতীয় স্বার্থকে সমন্বয় করে কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
ডলারের আধিপত্য কি কমবে?
বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ব্যাংকিং, ঋণ ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে ডলার গভীরভাবে যুক্ত। মার্কিন আর্থিক বাজারের ব্যাপ্তি ও গভীরতাও এর শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
এই বাস্তবতায় ব্রিকসের উদ্যোগের কারণে অদূর ভবিষ্যতে ডলারের আধিপত্য হঠাৎ শেষ হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে পরিবর্তন ঘটতে পারে অন্য পথে। ব্রিকসের সদস্যরা যদি নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ায়, বিকল্প আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং পারস্পরিক অর্থায়নে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে বেশি ব্যবহার করে, তাহলে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমতে পারে।
অর্থাৎ ব্রিকসের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য সম্ভবত ডলারকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং ডলারের একক আধিপত্যের পাশাপাশি একটি বিকল্প ও বহুমুখী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এ ধরনের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রভাবের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সেই প্রক্রিয়া ধীরগতির হবে এবং এর সাফল্য নির্ভর করবে ব্রিকস দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থা ও বাস্তব সহযোগিতার ওপর।
ব্রিকসের বাইরের দেশগুলোর সামনে সুযোগ ও ঝুঁকি
ব্রিকসের সম্প্রসারণের প্রভাব শুধু সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ধরণ পরিবর্তিত হলে ব্রিকসের বাইরের দেশগুলোকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখানে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তারা ব্রিকস-সম্পৃক্ত উৎস থেকেও ঋণ, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। নতুন বাজারেও প্রবেশের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
কিন্তু এর বিপরীত দিকও রয়েছে। বিশ্ব যদি ক্রমশ দুটি বা একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর জন্য ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠবে। কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য তাদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তাই ব্রিকসের উত্থানকে শুধু নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখলে চলবে না; সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক বিভাজনের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের পরিবর্তন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতি বৈদেশিক বাণিজ্য, রপ্তানি, আমদানি, জ্বালানি, বৈদেশিক ঋণ ও প্রবাসী আয়ের ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন হলে বাংলাদেশ তার বাইরে থাকতে পারবে না।
বাংলাদেশের জন্য ব্রিকস-সম্পৃক্ত অর্থায়ন ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন, শিল্প ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে বিকল্প উৎস থেকে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হবে।
তবে এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। বাংলাদেশের উচিত হবে না একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, জাপান এবং ব্রিকস—সব পক্ষের সঙ্গে বাস্তব স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখাই বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ পথ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে তাই ভবিষ্যতে ব্লক রাজনীতির পরিবর্তে ভারসাম্যের কূটনীতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনীতিতেও আসবে প্রভাব
ব্রিকসের বিকাশ কেবল অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; এর প্রভাব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়তে পারে। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে।
বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠ হবে, কোথা থেকে বিনিয়োগ নেবে, কীভাবে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করবে, বৈদেশিক ঋণের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করবে এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে জাতীয় স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত রাখবে—এসব প্রশ্ন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি কোনো একটি জোটকে অন্ধভাবে সমর্থন করাও দূরদর্শী নীতি নয়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে—সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
এককেন্দ্রিক বিশ্ব থেকে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে
ব্রিকসের উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই যে, বিশ্ব আর আগের মতো এককেন্দ্রিক থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এবং ডলার আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রধান মুদ্রা হিসেবে বহাল রয়েছে। কিন্তু চীন, ভারত, রাশিয়া এবং অন্যান্য উদীয়মান শক্তির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের ফলে আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থা সম্ভবত আরও বহুকেন্দ্রিক হবে। ব্রিকস সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলো কতটা বাস্তব সহযোগিতা করতে পারে, নিজেদের বিরোধ কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর।
সুতরাং ব্রিকসকে একদিকে যেমন ডলারের আধিপত্যের তাৎক্ষণিক বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, অন্যদিকে এর সম্ভাবনাকে খাটো করাও ভুল হবে। এটি হয়তো ডলারের অবস্থানকে ভেঙে দেবে না, কিন্তু ডলারনির্ভর একক আর্থিক ব্যবস্থার পাশে একটি শক্তিশালী বিকল্প কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা। পরিবর্তনশীল বিশ্বে আবেগের ভিত্তিতে নয়, বাস্তব স্বার্থ ও দূরদর্শী কূটনীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্রিকসকে কোনো পক্ষের বিজয় এবং অন্য পক্ষের পরাজয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে বাংলাদেশের উচিত এটিকে নতুন সুযোগ, নতুন ঝুঁকি এবং নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ হিসেবে বিবেচনা করা।
বিশ্বব্যবস্থা যখন বদলাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের কাজ কোনো এক শিবিরে গিয়ে দাঁড়ানো নয়; বরং পরিবর্তনের স্রোতের মধ্যে নিজের জাতীয় স্বার্থের জন্য সর্বোত্তম অবস্থানটি নিশ্চিত করা। আগামী দিনের সফল কূটনীতি হবে সেই কূটনীতি, যা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখবে, কিন্তু কারও ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করবে না।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিষ্ট এবং দি নিউ নেশন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক।
