আলোচনার পরিবেশ অনুকূল হলেই আশাবাদী হওয়ার সুযোগ থাকে
বাংলাদেশ পাঁচ দশক আগের সেই পুরনো দেশ নেই। দেশটি পরিণত হয়েছে, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে এবং বহু ধরনের দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের কূটনীতিতে পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে পররাষ্ট্রনীতিতে একরোখা বা একতরফা অবস্থান গ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাস্তবতা ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকেও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণও। ঢাকা জানিয়েছে, আমন্ত্রণটি বিবেচনাধীন রয়েছে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রধানমন্ত্রী সফরে যাওয়ার আগে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন বলে বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে।
এই অবস্থানকে ভারতের প্রতি বৈরিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। বরং এটি একটি মৌলিক কূটনৈতিক নীতির প্রতিফলন: দুই দেশের মধ্যে সংলাপ তখনই অর্থবহ হয়, যখন উভয় পক্ষেরই যথেষ্ট আস্থা থাকে যে তাদের উদ্বেগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শোনা ও সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় সামনে চলে আসে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ত্যাগের পর ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। পরবর্তীতে ঢাকা তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারত অনুরোধটি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে এবং বলেছে, দেশটির প্রযোজ্য আইনগত কাঠামো ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় বিষয়টি পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের কাছে এটি কেবল একটি বিমূর্ত কূটনৈতিক প্রশ্ন নয়। বিষয়টি যথেষ্ট রাজনৈতিক ও আইনগত গুরুত্ব অর্জন করেছে। একই সময়ে ভারতেরও নিজস্ব আইনগত প্রক্রিয়া ও জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। ফলে একটি টেকসই সমাধানের জন্য জনসমক্ষে বক্তব্য-বিবৃতির পরিবর্তে আন্তরিক ও কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ এ ধরনের যোগাযোগের একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তিনি জুন মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এরপর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। জুলাই মাসে তিনি বলেন, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে দুই দেশের এমন কোনো সমস্যা নেই, যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্ককে গঠনমূলকভাবে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।
এই আশাবাদ অবশ্যই স্বাগত জানানোর মতো। কিন্তু কেবল আশাবাদ দিয়ে কঠিন দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য—দুই দেশের নেতা একবার মুখোমুখি বসলে সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান হয়ে যাবে—শুনতে আকর্ষণীয়। কিন্তু কূটনীতি খুব কম ক্ষেত্রেই এত সরল। রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত রসায়নই যদি যথেষ্ট হতো, তাহলে বিশ্বের বহু দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ অনেক আগেই দূর হয়ে যেত।
তিস্তা ইস্যু এর একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এখনো সম্ভব হয়নি। এ সমস্যার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এখনো উভয় পক্ষ সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার কথা বলছে, কিন্তু মূল বিরোধের সমাধান হয়নি।
ঢাকা ক্রমেই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সমাধানের জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিস্তা অববাহিকার উন্নয়নেও বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছে। ভারত স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ নদীটি এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর কৌশলগত ও পরিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ ভারতের পরিবর্তে চীনকে বেছে নিতে চায়। এমন ধারণা একটি ভ্রান্ত দ্বৈততা সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের স্বার্থ হলো সব বড় শক্তি ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। জাপান, চীন , রাশিয়া এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য। লাখ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত, বিশেষ করে মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোতে, এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করছে এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী অংশীদারের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখছে।
সুতরাং বিচক্ষণ নীতি হলো কোনো বৃহৎ শক্তির অনুসারী বা অঙ্গরাষ্ট্রে পরিণত না হওয়া। বরং পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে এবং নদী, সড়ক, রেলপথ, বাণিজ্যপথ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মাধ্যমে দুই দেশ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। পানি ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি, বাণিজ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা অপরিহার্য।
তবে ভৌগোলিক নৈকট্য পারস্পরিক সংবেদনশীলতার গুরুত্বও বাড়িয়ে দেয়।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, ঐতিহাসিক স্মৃতি কীভাবে সমকালীন উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে। কলকাতা পৌর কর্পোরেশনের সিদ্ধান্তে জুন মাসে কলকাতার সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে গোপাল মুখার্জি রোড করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নামগুলোর ঐতিহাসিক ও সাম্প্রদায়িক তাৎপর্য বহন করার কারণে এ সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। ঐতিহাসিক বিবরণে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, সড়কটির মূল নামকরণ হয়েছিল স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে—যিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য; ১৯৪৬ সালের কলকাতা সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে নয়।
ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা যা-ই হোক না কেন, এ ধরনের প্রতীকী পদক্ষেপ সীমান্তের উভয় পাশে রাজনৈতিক ও আবেগগত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতেই পারে। দায়িত্বশীল কূটনীতির জন্য এসব বিষয় অন্য দেশে কীভাবে অনুভূত বা উপলব্ধি করা হচ্ছে, সে ব্যাপারে সংবেদনশীল থাকা জরুরি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে সীমিত কিছু দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে ভারতকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা এবং দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ কাঠামোর আওতায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের ফেরত চেয়েছে। ঢাকা এখন এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন করে শুরু হতে যাওয়া সংলাপের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এসব উদ্বেগ কতটা গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করা হয় তার ওপর।
বাংলাদেশের মানুষ তাদের ইতিহাস ভুলে যায়নি। রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় মর্যাদার জন্য তারা দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল নিশ্চয়ই অন্য কোনো রাষ্ট্রের উপগ্রহে পরিণত হওয়ার জন্য নয়।
ভূখণ্ড ও জনসংখ্যায় বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় ছোট হতে পারে, কিন্তু একটি দেশের মর্যাদা তার আয়তন বা জনসংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র যেমন তার প্রতিবেশীর বৈধ স্বার্থকে স্বীকৃতি দেবে, তেমনি তার বৃহৎ প্রতিবেশীর কাছ থেকেও নিজের বৈধ স্বার্থের স্বীকৃতি প্রত্যাশা করে।
অতএব বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উন্নত করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কোনো দেশই স্থায়ী সংঘাতের পথে যেতে চাইতে পারে না। কিন্তু কেবল বাকচাতুর্য্য দিয়ে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ন্যায্যতা, পারস্পরিক সমঝোতা, সংযম এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি।
নয়াদিল্লি যদি সত্যিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চায়, তাহলে সর্বোত্তম প্রস্তুতি হবে—ঢাকা যে অনুকূল পরিবেশের কথা বলেছে, তা সৃষ্টি করা।
একটি সফল শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল যেন শুধু উষ্ণ আলোকচিত্র ও আশ্বাসমূলক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেওয়া সমস্যাগুলোর সমাধানে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি হওয়া সময়ের দাবি।
সংলাপের দরজা খোলা থাকা উচিত। তবে বাংলাদেশকে সেই দরজা দিয়ে প্রবেশের আহ্বান জানানোর আগে উভয় পক্ষকেই নিশ্চিত হতে হবে যে, দরজার ভেতরের পরিবেশটি একটি অর্থবহ ও ফলপ্রসূ আলোচনার জন্য সত্যিই অনুকূল।
লেখক: সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও দ্য নিউ নেশনের উপদেষ্টা সম্পাদক।

