সাম্প্রতিক
জাসদ কার্যালয়ে গোপন বৈঠক, আ. লীগ সন্দেহে আটক শতাধিক আন্দোলন উত্তাল চুয়েট, নতুন ভিসিকে ‘রেড কার্ড’ দেখালেন শিক্ষার্থীরা ধানমন্ডিতে নিষিদ্ধ আ. লীগের মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ, আটক ৩ নেপালে ভয়াবহ বন্যার এক মাস: নিহত ১,৪৫৩, এখনো নিখোঁজ প্রায় ৬ হাজার ডেঙ্গুতে বেড়েই চলছে মৃত্যু, একদিনে ৮ প্রাণহানি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা: ‘যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি সই’ এমি অ্যাওয়ার্ডসে মনোনয়ন পেল আল-জাজিরার ‘হাসিনা: ৩৬ ডেইজ ইন জুলাই’ রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে ডিজে পার্টি, আড়ালে মাদক বিক্রি, গ্রেপ্তার ৪ হরমুজ খুলতে ইরানের ৭ দিনের রোডম্যাপ, সরাসরি ‘না’ ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দিনের সফরে কী কী হলো?
Skip to content

শিক্ষার বৈষম্য দূর করতে হলে সব ধারাকেই বিবেচনায় নিতে হবে

কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা। এর আগে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি পররাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পরিচিতি একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক হিসেবে। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর লেখা দুটি নিবন্ধ পড়ার পর মনে হয়েছে, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ ও চিন্তা রয়েছে।

তাঁর লেখার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তথ্যনির্ভরতা। সরকারের ভেতরে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার কারণে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। ফলে তাঁর সাম্প্রতিক লেখায় শিক্ষা ও উন্নয়ন সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য এবং বড় বড় প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো।

মেধাবীদের জন্য বিশেষ প্রতিষ্ঠান, নাকি সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা?
তাঁর সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা উচ্চমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগে কি সবার জন্য শিক্ষার একটি ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা উচিত নয়?

প্রশ্নটির গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রতিটি সংসদীয় আসনে দুটি করে মোট ৬০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্যাডেট কলেজের আদলে গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। তৌহিদ হোসেন যুক্তি দিয়েছেন, এমন বিপুল অর্থ বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করার পরিবর্তে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এই যুক্তির সঙ্গে একমত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ মেধা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা শহরের একচেটিয়া সম্পদ নয়। কিন্তু একটি দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিশু যদি মানসম্মত শিক্ষক, বই, প্রযুক্তি ও শিক্ষার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে তার প্রকৃত মেধা বিচার করা কঠিন। তাই মেধা চিহ্নিত করার আগে একটি তুলনামূলকভাবে level playing field বা সমতাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

প্রাথমিক শিক্ষার দুরবস্থা
তৌহিদ হোসেন তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেড় কোটির বেশি শিশু পড়াশোনা করে। সরকারি পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁর দাবি, মাত্র ১২ শতাংশ বিদ্যালয়ের মান ভালো; বাকি ৮৮ শতাংশ বিদ্যালয়ের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

এটি যদি সরকারি পরিদর্শন-ভিত্তিক তথ্য হয়, তাহলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ প্রাথমিক শিক্ষাই পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। ভিত্তি দুর্বল রেখে উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা অনেকটা দুর্বল ভিতের ওপর বহুতল ভবন নির্মাণের মতো।

তৌহিদ হোসেন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার মৌলিক মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব সুপারিশের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

তবে এখানেই একটি প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি নিজে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন—সচিব ও উপদেষ্টা হিসেবে নীতিনির্ধারণের কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে আজ তিনি যে সমস্যাগুলোর কথা বলছেন, সেগুলোর দায় কেবল রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর চাপিয়ে দিলে আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না। অতীতের নীতিনির্ধারকদেরও আত্মসমালোচনার জায়গা থাকা উচিত।

শহর ও গ্রামের শিক্ষাবৈষম্য
ঢাকা ও অন্যান্য শহরে এমন বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে শিক্ষার পরিবেশ তুলনামূলকভাবে উন্নত। কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। বিপরীতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু বিদ্যালয়ে এখনও শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং শিক্ষার মান নিয়ে সমস্যা রয়েছে।

এই বৈষম্য কেবল পরীক্ষার ফলাফলের বৈষম্য নয়; এটি ভবিষ্যৎ জীবনের সুযোগের বৈষম্য। একটি শিশু কোথায় জন্মেছে, তার বাবা-মায়ের আর্থিক সামর্থ্য কতটুকু এবং সে কোন বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে—এসব বিষয় তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার প্রশ্নটি আসলে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

মাধ্যমিক শিক্ষাতেও বৈষম্য
তৌহিদ হোসেন BANBEIS-এর তথ্যের ভিত্তিতে দেশে জুনিয়র ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যার বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর উল্লেখিত হিসাবে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অল্প, বিপরীতে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই MPO-ভুক্ত হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান এখনও MPO সুবিধার বাইরে রয়েছে।

এখানে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান—দুই বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সম্প্রতি বেসরকারি MPOভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষকদের বৈষম্য নিয়েও তিনি লিখেছেন। অর্থাৎ শিক্ষার বৈষম্য শুধু ছাত্রছাত্রীর মধ্যে নয়; প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের মধ্যেও রয়েছে।

কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা কোথায়?
এখানেই তাঁর সাম্প্রতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় আলিয়া ও কওমি—দুই ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষাকে বাদ দিয়ে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র সম্পূর্ণ করা কঠিন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। তাদের শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষা, ইংরেজি ভাষা, প্রযুক্তি এবং কর্মমুখী দক্ষতা—সবই জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ।

তাঁর ২০২৬ সালের একটি গবেষণাপত্রে অবশ্য সরকারি, বেসরকারি, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধারার প্রাথমিক শিক্ষার বহুমুখী কাঠামো নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বৈষম্য ও ভিন্নতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু সংবাদপত্রে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক মেগা প্রকল্প ও শিক্ষাবৈষম্য বিষয়ক আলোচনায় মাদ্রাসা শিক্ষার বাস্তবতা আরও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ছিল।

ধর্মীয় শিক্ষা কেউ ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ বা অপছন্দ করতেই পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়ে বাস্তবতা বড়। যে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় পড়ছে, তারাও বাংলাদেশের নাগরিক এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের অংশ। তাদের শিক্ষার মান উন্নত করা, আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত সমতা
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো আরও একটি নতুন অভিজাত প্রতিষ্ঠান নয়; বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মানের ব্যবধান কমানো।

মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উৎকর্ষের সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু তার আগে প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশুটিকেও এমন শিক্ষা দিতে হবে, যাতে সে নিজের মেধা প্রকাশের ন্যায্য সুযোগ পায়। সরকারি বিদ্যালয়, বেসরকারি বিদ্যালয়, ইংরেজি মাধ্যম এবং মাদ্রাসা—সব ধারার শিক্ষার্থীকেই জাতীয় মানবসম্পদের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

তৌহিদ হোসেনের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই—মানবসম্পদে বিনিয়োগকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সমান, বরং দীর্ঘমেয়াদে তার ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। তিনি নিজেও অতীতে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিশুর জন্মস্থান, পরিবারের আয়, প্রতিষ্ঠানের ধরন কিংবা শিক্ষার ধারা তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রধান কারণ হবে না। মেধার বিকাশের জন্য প্রথমে সুযোগের সমতা তৈরি করতে হবে। তারপর যে যার যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাবে। শিক্ষার বৈষম্য দূর করতে হলে তাই কোনো একটি ধারাকে নয়—পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই সংস্কারের আওতায় আনতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দি নিউ নেশন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক।