সাম্প্রতিক
Skip to content

সড়ক নিরাপত্তা আইন: বর্তমান প্রেক্ষিত ও সরকারের অংশীদার

সড়ক মানুষের চলাচল, জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অথচ প্রতিদিনের যাতায়াতে মানুষের জীবন যখন অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন সড়ক দুর্ঘটনাকে শুধু চালকের ভুল বা অনিবার্য দুর্ভাগ্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। একটি দুর্ঘটনার পেছনে থাকতে পারে অতিরিক্ত গতি, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক নকশা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কিংবা দুর্ঘটনার পর চিকিৎসায় বিলম্ব। এসব ঝুঁকি কমাতে বিচ্ছিন্ন অভিযান বা সচেতনতামূলক প্রচার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর আইন, যা দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করবে, আহত মানুষের জীবন রক্ষায় জরুরি সেবা নিশ্চিত করবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ যানবাহন, চালক, লাইসেন্স, রুট পারমিট ও পরিবহন-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ আইন। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তা শুধু যানবাহন পরিচালনা বা আইনভঙ্গের শাস্তির বিষয় নয়। সড়কের নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণ, পথচারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার, যানবাহনের কারিগরি নিরাপত্তা, গতিসীমা, জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা, দুর্ঘটনা তদন্ত, তথ্য প্রকাশ এবং সংস্থাগুলোর সমন্বয়-এসবও সড়ক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোয় আনার জন্য স্বতন্ত্র সড়ক নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন রয়েছে।

দুর্ঘটনায় হতাহতের হিসাবও এই প্রয়োজনকে সামনে আনে। সরকারের এসডিজি তথ্যভান্ডারে বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫,২০৫ জন নিহতের তথ্য রয়েছে। বিআরটিএর তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা একই বছরে ৫,৮৪০ জন নিহতের কথা জানিয়েছে। বিভিন সংগঠনের উদ্যোগে সংবাদমাধ্যম ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে ৭,২৯৪ জন বা আরও বেশি এবং ২০২৫ সালে ৭,৩৫৯ জন বা আরও বেশি নিহতের হিসাব প্রকাশ করেছে। এসব সংখ্যা ভিন্ন উৎস ও পদ্ধতিতে সংগৃহীত; তাই এগুলোকে সরাসরি তুলনা করে কোনো একটিকে চূড়ান্ত হিসাব বলা যায় না। তবে এই ব্যবধানই প্রমাণ করে, পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, বিআরটিএ ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থার তথ্য সমন্বিত করে নির্ভরযোগ্য জাতীয় দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে ২০২১ সালের জন্য বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে ৫,০৮৪ জন নিহতের তথ্য রয়েছে; একই প্রতিবেদনে সংস্থাটির মডেলভিত্তিক অনুমান প্রায় ৩১,৫৭৮। এই অনুমান ২০২১ সালের, বর্তমান মৃত্যুসংখ্যা নয়। তবে সরকারি হিসাব ও মডেলভিত্তিক অনুমানের পার্থক্য দুর্ঘটনা-পরবর্তী মৃত্যু, তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তাই মৃত্যুর অভিন্ন সংজ্ঞা, তথ্য সংগ্রহের একক পদ্ধতি এবং নিয়মিত প্রকাশ্য প্রতিবেদন নিশ্চিত করতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, স্বতন্ত্র আইন তৈরির প্রক্রিয়া ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়। একটি উপকমিটি খসড়া তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, খসড়াটি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও পরবর্তী অংশীজন পরামর্শের অপেক্ষায় রয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’ সম্পর্কে বলা হয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ খসড়াটি মন্ত্রিসভায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৫ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে এক আলোচনায় সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ২০২৭ সালের মধ্যে সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকারের অঙ্গীকারের কথা জানান।

মন্ত্রী হেলমেটের মান হালনাগাদ, গতিসীমা কার্যকর করা, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা, মহাসড়কে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পারাপার এবং দুর্ঘটনার তথ্য ব্যবস্থাপনার কথাও বলেছেন। আগের ঘোষণায় বাস ও ট্রাকের সর্বোচ্চ পরিচালন-সময়সীমা, বাতিলযোগ্য যানবাহন অপসারণ, মহাসড়কে অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসা শক্তিশালী করার উদ্যোগের উল্লেখ ছিল। এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। তবে খসড়া প্রস্তুত, মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা, অংশীজনের মতামত, মন্ত্রিসভার অনুমোদন, সংসদে উত্থাপন এবং আইন পাস প্রতিটি পৃথক ধাপ। প্রস্তাবিত বিধানগুলো এখনো খসড়ার পর্যায়ে থাকলে সেগুলোকে কার্যকর আইন হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। তাই সরকারকে খসড়ার বর্তমান অবস্থা, পরবর্তী ধাপ, পরামর্শের সময়সূচি এবং ২০২৭ সালের লক্ষ্যে পৌঁছানোর কর্মপরিকল্পনা নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

নতুন আইনটি হতে হবে ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতির ভিত্তিতে। এই পদ্ধতি স্বীকার করে যে মানুষ ভুল করতে পারে এবং সংঘর্ষের শক্তি সহ্য করার ক্ষেত্রে মানুষের শারীরিক সীমা রয়েছে। তাই পরিবহনব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়তে হবে, যাতে একটি ভুল বা দুর্ঘটনা অনিবার্যভাবে মৃত্যু কিংবা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ গতি, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর কার্যকর চিকিৎসা এই উপাদানগুলোকে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করাই এর লক্ষ্য। জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১–২০৩০ সালের বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনাও নিরাপত্তাকে সড়কব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখে এবং দায় শুধু চালক বা পথচারীর ওপর না চাপিয়ে পুরো ব্যবস্থার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ করে দেয়।

সড়ক নিরাপত্তা আইনে নিরাপদ অবকাঠামোর দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা জরুরি। নতুন সড়ক বা বড় সংস্কার প্রকল্প অনুমোদনের আগে নিরাপত্তা প্রভাব মূল্যায়ন, নির্মাণকালে মান তদারকি এবং চালুর পর নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা থাকা উচিত। বিপজ্জনক বাঁক, দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত স্থান, ত্রুটিপূর্ণ সাইন ও মার্কিং, অরক্ষিত সড়ক বিভাজক, ঝুঁকিপূর্ণ প্রবেশপথ এবং রেলক্রসিং শনাক্ত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও জনবসতিতে ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, পর্যাপ্ত আলো এবং স্থানভিত্তিক গতিসীমা নিশ্চিত করতে হবে। পথচারী, সাইকেলচালক, মোটরসাইকেল আরোহী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিরাপত্তা সড়ক পরিকল্পনার শুরু থেকেই বিবেচনা করতে হবে।

গতিসীমা নির্ধারণ ও বাস্তব প্রয়োগে আইনে সুস্পষ্ট বিধান থাকা প্রয়োজন। শুধু সাইনবোর্ড বসিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। সড়কের ধরন, জনবসতি, স্কুল, হাসপাতাল ও পথচারীর উপস্থিতি বিবেচনায় গতিসীমা নির্ধারণ করতে হবে; স্থানীয় ঝুঁকি অনুযায়ী তা কমানোর ক্ষমতাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের থাকা দরকার। যেখানে উপযোগী, সেখানে গতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, স্বচ্ছ জরিমানা পদ্ধতি ও আইনভঙ্গের রেকর্ড ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মানসম্মত ও সঠিকভাবে বাঁধা হেলমেট, গাড়ির সব আসনে সিটবেল্ট, শিশুদের উপযোগী আসন-নিরাপত্তা এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো প্রতিরোধে প্রমাণভিত্তিক ও প্রয়োগযোগ্য বিধান থাকতে হবে।

চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। লাইসেন্স দেওয়ার আগে তাত্ত্বিক জ্ঞান, ব্যবহারিক দক্ষতা, দৃষ্টিশক্তি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা যাচাই করা দরকার। পেশাদার চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা উচিত। চালকদের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম ও বিরতির নিয়ম না থাকলে ক্লান্ত অবস্থায় চালনার ঝুঁকি কমানো যাবে না। পরিবহন মালিক ও ব্যবস্থাপকদেরও চালকের ওপর অযৌক্তিক সময়সীমা বা অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ না দেওয়ার দায়িত্ব আইনে নির্ধারণ করতে হবে। নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা চালকের একার দায়িত্ব নয়, যিনি চালক নিয়োগ করেন, গাড়ি পরিচালনা করেন এবং যাত্রার সময়সূচি নির্ধারণ করেন, তাঁরাও নিরাপত্তার অংশীদার।

যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা বাস্তব কারিগরি পরীক্ষার ভিত্তিতে হতে হবে। ব্রেক, টায়ার, আলো, স্টিয়ারিং ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ যাচাই ছাড়া সনদ দেওয়া যাবে না। পরীক্ষাকেন্দ্রের অনিয়ম, জাল সনদ এবং ত্রুটিপূর্ণ গাড়িকে রাস্তায় চলতে দেওয়ার ক্ষেত্রে কার দায়, তা আইনে স্পষ্ট করতে হবে। গণপরিবহন ও পণ্যবাহী বহরের মালিকদের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের নথি রাখতে হবে। বাতিলযোগ্য যানবাহন অপসারণ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে। নতুন যানবাহনের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ক্রেতাকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়ার বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রস্তাবিত আইনের মানবিক ও জরুরি অংশ হবে দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। আহত ব্যক্তিকে নিকটস্থ হাসপাতাল বা ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে পরিচয় যাচাই, নিবন্ধন বা অর্থ জমার অযথা বিলম্ব ছাড়াই। গুরুতর আহত ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল না করে অন্যত্র পাঠানো যাবে না। জরুরি চিকিৎসার ব্যয় কে বহন করবে, সরকারি প্রতিপূরণ কীভাবে হবে এবং চিকিৎসায় অস্বীকৃতি বা বিলম্ব হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে আইনে তা স্পষ্ট করা দরকার। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উদ্ধারদল, অ্যাম্বুলেন্স যোগাযোগ, হাসপাতাল রেফারেল এবং ট্রমা চিকিৎসার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। আহত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের বিষয়টিও আইনে স্থান পাওয়া উচিত। খসড়া আইনে হাসপাতালের জরুরি সেবা ও পুনর্বাসন নিয়ে যে প্রস্তাবের কথা প্রকাশিত হয়েছে, তা যথাযথ অর্থায়ন ও দায়িত্ব নির্ধারণসহ চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনা তথ্য, তদন্ত ও প্রতিরোধের বিষয়গুলোও আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, বিআরটিএ ও সড়ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অভিন্ন সংজ্ঞা ও পদ্ধতিতে নথিভুক্ত করে একটি জাতীয় ডেটাবেস তৈরি করা দরকার। প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যানবাহন, সড়ক, গতি, চালকের কর্মপরিবেশ এবং জরুরি সেবার প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করতে হবে। তদন্তের উদ্দেশ্য শুধু দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয়; একই ধরনের দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে, তার জন্য ব্যবস্থাগত ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধন করাও। প্রতিবছর দুর্ঘটনার তথ্য, তদন্তের ফল, গৃহীত ব্যবস্থা ও অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।

এই দায়িত্ব পালনের জন্য একটি ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বা স্থায়ী সমন্বয় কাঠামো প্রয়োজন। প্রস্তাবিত খসড়ায় জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কথা রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এই কর্তৃপক্ষের কাজ হবে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি, মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দায়িত্ব সমন্বয়, দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, বাজেট ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ। কর্তৃপক্ষ যেন শুধু সভা বা সুপারিশে সীমাবদ্ধ না থাকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার কাজ ও সময়সীমা যাচাই এবং অগ্রগতি প্রকাশের বাস্তব ক্ষমতা থাকতে হবে। পরিবহন মালিক-শ্রমিক, স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় সরকার, গবেষক, নাগরিক সংগঠন এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মতামতও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব পেতে হবে।

এখানেই নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সামাজিক আন্দোলন তিন দশকের বেশি সময় ধরে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা, প্রশিক্ষণ, নীতিগত দাবি এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কাজ করছে। নিসচার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির ১২০টির বেশি স্থানীয় শাখা রয়েছে; চালক ও সাধারণ সড়ক ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রচার-অ্যাডভোকেসি এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তা তাদের কাজের অন্তর্ভুক্ত। সংগঠনটি চালক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমেও পেশাদার চালক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

নিসচার এই মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন দুই ক্ষেত্রেই কাজে লাগতে পারে। ২০২৫ সালে সংগঠনটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন, পথচারী সুরক্ষা, নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতি, মানসম্মত হেলমেট, সিটবেল্ট, শিশুদের নিরাপত্তা এবং বিশ্বব্যাংকের সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের পূর্ণ ব্যবহারসহ বিভিন্ন দাবি তুলেছিল। একই বছর দেশব্যাপী ১,২৩৫টি কর্মসূচির পরিকল্পনার কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, এর মধ্যে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, চালকদের দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের সচেতনতা এবং আইন মানার প্রচার ছিল।

জাতিসংঘ ২০২১–২০৩০ সময়কালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনার বৈশ্বিক লক্ষ্য গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও ২০৩০ সালের মধ্যে মৃত্যুহার অর্ধেকে নামানোর অঙ্গীকার করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সড়ক নিরাপত্তা আইনকে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার ভিত্তি হতে হবে। কত মৃত্যু কমল, কত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান নিরাপদ হলো, কত চালক প্রশিক্ষণ পেলেন, কত দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাল এবং কত হাসপাতাল জরুরি চিকিৎসা দিচ্ছে এসব সূচক নির্ধারণ করে নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকারের বর্তমান উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আমরা দ্রুত, স্বচ্ছ ও জনসম্পৃক্ত অগ্রগতি প্রত্যাশা করি। ২০২৭ সালের মধ্যে আইন প্রণয়নের ঘোষিত লক্ষ্য পূরণে খসড়া পর্যালোচনা, আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়, জনপরামর্শ, মন্ত্রিসভার বিবেচনা ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা প্রকাশ করা প্রয়োজন। আইনটি শুধু অপরাধ ও শাস্তির দলিল হলে চলবে না, এটি হতে হবে নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, দায়িত্বশীল চালনা, দ্রুত চিকিৎসা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সমন্বিত ভিত্তি। নিসচাসহ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সংগঠনগুলোর জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের সংযোগ ও জনসম্পৃক্ততাকে এই কাজে অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করলে আইনটি মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের আরও কাছাকাছি হবে।

সড়কে প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারকে বদলে দেয়, আর প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য গভীর ক্ষতি। মানুষের জীবনকে যাতায়াত ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। খসড়া থেকে আইন, আইন থেকে বিধিমালা, আর বিধিমালা থেকে মাঠপর্যায়ের কার্যকর পদক্ষেপ প্রতিটি ধাপে যেন সময়সীমা, দায়িত্ব ও জবাবদিহি থাকে। একটি শক্তিশালী, ন্যায়সংগত ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইনই পারে নিরাপদ চলাচলকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। এখন প্রয়োজন ঘোষণাকে বাস্তব কাজে রূপ দেওয়া।

মহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)