কুবিতে চিকিৎসা খাতে মাথাপিছু মাসিক বরাদ্দ সাড়ে ৮ টাকা
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট ৭ লাখ টাকা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বছরে স্বাস্থ্যসেবা বাবদ মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে মাত্র ১০২ টাকা ৫৪ পয়সা এবং মাসিক হিসাবে এ বরাদ্দ দাঁড়ায় ৮ টাকা ৫৫ পয়সা। প্রয়োজনের তুলনায় এ বরাদ্দ খুবই সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৩–২৪ ও ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চিকিৎসা খাতে বাজেট ছিল ৬ লাখ টাকা। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ টাকা এবং চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরেও চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ লাখ টাকা ।
এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মোট বাজেটের আকার ৮৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ফলে মোট বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতের আকার দাঁড়ায় শূন্য দশমিক শূন্য ৮৪ শতাংশে (০.০৮৪%)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শাখার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ হাজার ২১৩ জন। এ ছাড়া ২৮৬ জন শিক্ষক এবং ৩২৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের মোট সদস্যসংখ্যা ৬ হাজার ৮২৭ জন। এই হিসাবে মাথাপিছু বার্ষিক বরাদ্দ গিয়ে দাঁড়ায় ১০২ টাকা ৫৪ পয়সায় এবং মাসিক বরাদ্দ ৮ টাকা ৫৫ পয়সায়।
মেডিকেল সেন্টারের তথ্য মতে, স্বাস্থ্য সেবা খাতের মোট বরাদ্দের ২০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা মেডিকেলের যন্ত্রপাতি কেনা ও মেরামত বাবদ ব্যয় হয়। অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় করা হয় ১২ প্রকার ওষুধ কেনা বাবদ। এ ছাড়া প্রতি মাসে ইন্সট্রুমেন্টসহ ওষুধ কেনা বাবদ খরচ করা হয় ৬০ হাজার টাকা। যেখানে আবার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ১৫ শতাংশ মেডিকেল ভ্যাট।
অন্যদিকে মেডিকেল সেন্টারে রয়েছে চিকিৎসকেরও অপ্রতুলতা। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিপরীতে বর্তমানে মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক রয়েছেন পাঁচজন। এর মধ্যে একজন শিক্ষাছুটিতে থাকায় বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন চারজন চিকিৎসক। এ ছাড়া রয়েছেন দুইজন খণ্ডকালীন ডাক্তার, একজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও একজন নার্স এবং তিনজন সাপোর্টিভ স্টাফ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও মেডিকেল সেন্টারের ওষুধ ও চিকিৎসক সংকটসহ এর সেবা নিয়ে রয়েছে নানাবিধ অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত রোগী দেখার চাপ থাকায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। তাছাড়া মেডিকেল সেন্টার থেকে মাত্র ১২ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করায় অধিকাংশ ওষুধই বাইরের ফার্মেসী থেকে কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
ফলে মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান বাড়ানোর জন্য আরও বেশি ওষুধ সরবরাহ, ফার্মাসিস্ট নিয়োগসহ একটি মিনি প্যাথোলজি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. বায়েজিদ হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে অবহেলিত সেক্টর হচ্ছে মেডিকেল সেক্টর। শিক্ষার্থীরা এখানে ন্যূনতম সেবা পায় না। ছয় হাজার শিক্ষার্থীর জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্স যথেষ্ট নয়। আমি দাঁতের ব্যথার জন্য মেডিকেল সেন্টারে গিয়েছিলাম। আমাকে শুধু গ্যাসের ট্যাবলেট আর এইস দেওয়া হয়েছে। মেডিকেল সেন্টারে গেলে এই দুটি ছাড়া আর কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না।’
ফার্মেসী বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারকে নাপা সেন্টার বলা হয়। বর্তমানে কিছু ওষুধ আসছে। কিন্তু এতে পরিপূর্ণ সেবা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো শিক্ষার্থীর জ্বর হলে তাকে ব্লাড টেস্টের জন্য শহরে যেতে হয়। আমাদের ছোটোখাটো সমস্যার জন্য যে সেবাটা প্রয়োজন, সেটা যথেষ্ট পরিমাণে নেই। পরিপূর্ণ একটি সেবাদান কেন্দ্র করার জন্য একটি মিনি প্যাথোলজি, একজন ফার্মাসিস্ট এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন। এতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের প্রধান ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের স্টেকহোল্ডারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, ওষুধের চাহিদাও বাড়ছে। সে তুলনায় ওষুধের জোগান কম আছে। প্রতিবছর ইন্সট্রুমেন্ট কিনতে মোট বাজেটের প্রায় ২০ শতাংশ খরচ হয়। প্রতি মাসে যে পরিমাণ ওষুধ কেনা হয়, সেই টাকার ১৫ শতাংশ মেডিকেল ট্যাক্স দিতে হয়।’
মেডিকেল সেন্টারে আরও লোকবল প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষক, কর্মকর্তাদের বিপরীতে আমাদের জনবলও কম আছে। উপাচার্য স্যারকে জানিয়েছি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের কিছু লোকবল দরকার। মেডিকেল সেন্টারে একজন আবাসিক চিকিৎসক প্রয়োজন, বিশেষ করে শুক্রবার-শনিবার বন্ধের দিন প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারবে। আমাদের মেডিকেল সেন্টারে একজন ফার্মাসিস্ট সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। মেডিকেল সেন্টার সার্বক্ষণিক পরিষ্কারের জন্য একজন ক্লিনারও দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যদি মিনি প্যাথলজি থাকত, এখন যে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চলছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা যেত। আগামী কিছুদিনের মধ্যে আমাদের মিনি অপারেশন থিয়েটার চালু হবে। সেখানে আমরা প্রাথমিক ট্রিটমেন্টগুলো দিতে পারব। সবকিছু প্রস্তুত আছে, রুমটি বুঝে পেলেই আমরা কার্যক্রম শুরু করতে পারব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে আমরা আরও বাজেট চাই। সেক্ষেত্রে বেশি বাজেট পেলে চিকিৎসা খাতেও বাজেট বাড়াতে পারব। এ ছাড়া বর্তমানে ওষুধের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই পরিমাণ ওষুধ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে একটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।’
এনএনবাংলা/
