দলাদলি বন্ধ করুন, নইলে শিক্ষকতা ছেড়ে দিন: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি

শিক্ষকদের দলাদলি ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেছেন, শিক্ষকতা শুধু জীবিকা অর্জনের পেশা নয়, এটি সম্মান ও দায়িত্বের জায়গা। শিক্ষকতার মর্যাদা নিজেরাই রক্ষা করতে না পারলে এই পরিচয় ব্যবহার করে বিভাজন বা দলাদলিতে জড়ানো উচিত নয়।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁও কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ঢাকা জেলা পর্যায়ের ‘আন্তঃকলেজ সাংস্কৃতিক ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
‘দলাদলি বন্ধ করুন, নইলে শিক্ষকতা ছেড়ে দিন’
অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষকদের উদ্দেশে অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, ‘দলাদলি বন্ধ করুন, নতুবা শিক্ষকতা ছেড়ে দিন। গত ১৭ বছরের ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখন সামনে তাকানোর সময়। সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতা করুন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করুন। আমরা আর ব্যাকডেটেড থাকতে চাই না।’
শিক্ষকতা পেশার মর্যাদার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অর্থবিত্তের চেয়ে সম্মান এবং মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগকে গুরুত্ব দিয়েই অনেকে এই পেশায় আসেন। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রত্যয় থেকেই অনেকে শিক্ষকতাকে বেছে নেন। তাই শিক্ষক হওয়ার পর এই পেশার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক শিক্ষকের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকতার সম্মান নিজেরাই ধরে রাখতে না পারলে শিক্ষকতার নামে এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যা এই পেশার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে বিকল্প পেশা বা আয়ের পথ বেছে নেওয়াই ভালো।
শিক্ষকদের সহযোগিতা চাইলেন ভিসি
শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেন, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’, ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’, ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে শিক্ষকদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
তার ভাষ্য, শিক্ষকরা সহযোগিতা না করলে সরকার কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একা এসব লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। শিক্ষার্থীদের মুখের দিকে তাকিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যে নতুন যাত্রা শুরু করেছে, তাতে সবাইকে অংশ নিতে হবে।
শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ করাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করাই মূল উদ্দেশ্য।
পিএইচডিতে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত স্কলারশিপ
শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর কথা জানিয়ে অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, শিক্ষকদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ আরও সহজ করা হয়েছে। আগে পিএইচডির জন্য সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা পর্যন্ত স্কলারশিপের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি ফুলটাইম ও পার্টটাইম এমফিল এবং গবেষণা সম্পন্ন করার সুযোগও রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে সুযোগ আরও বাড়ানো হচ্ছে জানিয়ে ভিসি বলেন, শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে এসে নিজেদের দক্ষতা বাড়াবেন এবং অর্জিত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেবেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল শিক্ষার্থীসমাজকে এগিয়ে নিতে দক্ষ ও নিবেদিত শিক্ষকই সবচেয়ে বড় শক্তি।
‘শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়’
শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিতর্কে যুক্ত হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব নয়।
তার মতে, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহনশীলতা বাড়াতেও সহায়তা করে।
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির লক্ষ্য এমন একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে শিখবে এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করবে বলেও জানান তিনি।
২৫ কলেজের ৩৫৭ শিক্ষার্থী অংশ নেন
সরকারের ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তেজগাঁও কলেজের মিলনায়তনে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ঢাকা জেলার ২৫টি কলেজের ৩৫৭ জন শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।
প্রতিযোগিতায় গান, নৃত্য, কবিতা, আবৃত্তিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন শিক্ষার্থীরা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তেজগাঁও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক শামীমা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কলেজের মিডিয়া অ্যান্ড থিয়েটার স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নওরীন সাজ্জাদ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন, শারীরিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক দপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল করিম, স্নাতকোত্তর শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. ফকির রফিকুল আলম, স্নাতকপূর্ব শিক্ষা বিষয়ক স্কুলের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. আশেক কবির চৌধুরীসহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রতিনিধিরা।
জেলা পর্যায়ে বিজয়ী শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নেবেন। বিভাগীয় পর্যায়ের বিজয়ীদের মধ্য থেকে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন।
এনএনবাংলা/
